ঢাকাবুধবার , ১১ জানুয়ারি ২০২৩
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খেলাধুলা
  4. দেশজুড়ে
  5. পজিটিভ বাংলাদেশ
  6. ফটো গ্যালারি
  7. ফিচার
  8. বিনোদন
  9. ভিডিও গ্যালারি
  10. সারাদেশ
  11. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কিশোরগঞ্জে সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবে অপরাধে জড়াচ্ছে তারুণ্য

প্রতিবেদক
Kolom 24
জানুয়ারি ১১, ২০২৩ ৫:২১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কিশোরগঞ্জ ছিল সংস্কৃতি চর্চার উর্বর ভূমি। এ অঞ্চলের বাউল গান, সারিগান, জারি গান, বিয়ের গীত, দেহতত্ত্ব, শরিয়তি, মারফতি, মুর্শিদি, মরমি, লোকগীতি, ভাটিয়ালি, পালাগান, ঘেটুগানসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গানের কোনো তুলনা নেই এবং ছিলও না। লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি ছিল আয়োজিত সংস্কৃতিচর্চা, পাড়ায় পাড়ায় ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন, পাঠাগার; ঘরে ঘরে ছিল হারমোনিয়াম। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনগুলো শিশু-কিশোরদের বিকাশে অবদান রাখত। জনপদে জনপদে নাটক মঞ্চস্থ হতো। আর শীতকালে গ্রামগুলো মুখর ছিল যাত্রা, জারি-সারি-পালাগানের আসরে। কালের পরিক্রমায় কিশোরগঞ্জের মানুষজন এখন সংস্কৃতি বিমুখ।গ্রামে গ্রামে যেটুকু সংস্কৃতির চর্চা ছিল সেটা আজ নেই।

জানা গেছে, সংস্কৃতি চর্চা, লাইব্রেরি কমে যাওয়া ও খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ না থাকায় কিশোর এবং তরুণরা তাদের সময় কাটায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে নতুবা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বেপরোয়া হয়ে উঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা ইউটিউবে মৌলবাদীদের ভিডিও দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্মান্ধতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। পাড়া মহল্লায় অনেক মানুষের মাঝে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে, তারা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়েই তাদের মনোভাব ব্যক্ত করে। এছাড়া গত ১০ থেকে ১২ বছরে পাড়া মহল্লায় ছোট ছোট দলে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং চক্র। মারামারি, জমি দখল, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল, হিরোইজম দেখানো, ভয়ভীতি এবং মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করতে এই কিশোর গ্যাংয়ের জন্ম দিচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। মোটর সাইকেলের ভয়ংকর মহড়া, মাদক এবং ইয়াবা সেবন ও বিক্রি, চাঁদাবাজি, মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা এমনকি বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িয়েছে কিশোররা।

সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, সংস্কৃতির চর্চা সমাজে যখন থাকে না, তখন সমাজের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ আবহে জন্ম নেয় প্রতিক্রিয়াশীলতা ধর্মান্ধতা। আমাদের সংস্কৃতির জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেই শূন্যতা দ্রুত পূরণ করতে আসছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী। সাংস্কৃতিক সংকটই উসকে দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীতা ও বেপরোয়া কিশোর গ্যাং কালচারকে।

যাত্রা, পালাগান, কবিগান, মেলা কিশোরগঞ্জের সংস্কৃতির অংশ। বারো মাসে তেরো পার্বণ না হওয়ার কারণে মেলা বা যাত্রাপালা করার মতো পরিবেশ গ্রামে একবারে নেই বললেই চলে। নির্মল বিনোদনের কোনো উপকরণ গ্রামের মানুষের কাছে নেই।’ অশ্লীলতার ‘অভিযোগে’ অনেকটা বন্ধ হয়ে গেছে যাত্রাশিল্প। যাত্রাকে নানান দোষ দিয়ে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা বিদ্যমান রয়েছে। যাত্রাকে ‘খারাপ কাজ’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মানুষ, মূলত তারাই ন্যক্কারজনকভাবে সেটি করছে। সার্কাস, পুতুলনাচ, ভাটি গানের মতো সংস্কৃতি থমকে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি কর্মীরা।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার বলে দাবি জানাচ্ছেন কিশোরগঞ্জের শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র রাজনীতিবিদরা। তারা বলছেন, কিশোর ও তরুণ সমাজকে বর্বরতা ও নিমর্মতার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করা। সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার অভাবে কিশোর ও তরুণরা পরিবার এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভুলপথে পরিচালিত হচ্ছে। ভুলশিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে নৃশংসতার পথ বেছে নিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা না থাকা এবং খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে তরুণরা সামাজিক-সম্প্রীতি থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে তাদের চিন্তাভাবনা। ফলে তরুণরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভুল শিক্ষা নিয়ে ধর্মান্ধতা ও অপরাধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

সংস্কৃতি নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। তাই সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সময় সাংস্কৃতিক উৎসব করা হলেও সেগুলো সপ্রাণ হতে পারছে না। এভাবেই সংস্কৃতি থেকে কিশোরগঞ্জের মানুষ ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে।’ আমাদের সংস্কৃতি এখন ক্ষমতাবানদের হাতে চলে গেছে। ফলে প্রাণের যোগ গেছে কমে, প্রায় সবই এখন আনুষ্ঠানিক। তাই সংস্কৃতির সঙ্গে জনতার বন্ধনও ক্রমেই আলাদা হয়ে গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈশা খাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও কলামিস্ট বদরুল হুদা সোহেল বলেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে এ জেলায়। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবের প্রতি কিশোর ও তরুণদের আসক্তি এতোটাই বেড়ে গেছে যে আমাদের কৃষ্টি-কালচার সম্পর্কে সম্মক জ্ঞানের নেয় না। অন্যদিকে পারিবারিক বা সামাজিক বন্ধন পূর্বের ন্যায় এখন আর ততোটা দৃঢ় নয়। তাছাড়া মানুষ এখন তাৎক্ষনিক গেইন বা লাভের প্রতি ছুটছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে তারা প্রাধান্যই দিচ্ছে না।

চন্দ্রাবতী আবৃত্তি পরিষদের সভাপতি ম ম জুয়েল বলেন, স্বীকার করতেই হবে ৮০ বা ৯০ দশকে কিশোরগঞ্জের যে উর্বর সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিলো ক্রমান্বয়ে তা অনুর্বর হতে হতে আজ প্রায় নিস্ফলা হয়ে গেছে। এর অন্যতম কারন হচ্ছে, যোগ্য নেতৃত্বের অভাব অর্থাৎ কর্মী হওয়ার যোগ্যাতা অর্জন না করেই সংগঠন বানিয়ে নেতৃত্বের বাহারিরূপ ধারণ। ফলে অধঃগমন হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের এবং তরুন সমাজ তার সমাজিক বা সাংস্কৃতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে ধাবিত হচ্ছে অপসংস্কৃতির পথে বা অপকর্মে।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ বলেন, শিশু, কিশোর ও তারুণ্যরা সাংস্কৃতিক চর্চা, লাইব্রেরি ও খেলাধুলা কমে যাওয়ায় মাদক, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ, কিশোর গ্যাং কালচারসহ নানা মাত্রিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আইন মান্যকারী হয় সে লক্ষ্যে পুলিশ কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে প্রতিটি স্কুলে সচেতনতামূলক কার্যক্রম করছে।