ঢাকাশুক্রবার , ১২ এপ্রিল ২০২৪
  1. অন্যান্য
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খেলাধুলা
  4. দেশজুড়ে
  5. পজিটিভ বাংলাদেশ
  6. ফটো গ্যালারি
  7. ফিচার
  8. বিনোদন
  9. ভিডিও গ্যালারি
  10. সারাদেশ
  11. সাহিত্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ জামাতে ৭ লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণ

প্রতিবেদক
Kolom 24
এপ্রিল ১২, ২০২৪ ৩:২৪ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ভোর ৫টা। মৃদু ঠান্ডা হাওয়ায় স্বর্গীয় আনন্দ নিয়ে চর্তুদিক থেকে শোলাকিয়া ঈদগাহের দিকে যাচ্ছে মানুষ। নিরাপত্তার স্বার্থে সকাল ৭টার আগে মুসুল্লিদের ঈদগাহে প্রবেশ করতে দেয়নি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সকাল ৭টার দিকে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে প্রত্যেক মুসল্লিকে তল্লাশি করে ঈদগাহে ঢুকতে দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। সকাল সাড়ে ৮ টার দিকেই সাত একর আয়তনের শোলাকিয়া মাঠ পূর্ণ হয়ে যায়। ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে আসা দেশ-বিদেশের কয়েক লাখ মুসল্লির ভিড়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয় শোলাকিয়া ময়দান। আগত মুসল্লিদের অনেকে মাঠে জায়গা না পেয়ে পার্শ্ববতী রাস্তা, বাড়ির ছাদ, তিনপাশের ফাঁকা জায়গা, নদীর পাড় ও শোলাকিয়া সেতুতে জায়গা করে নিয়ে জামাতের জন্য দাঁড়িয়ে পড়েন।

সকাল ১০টায় প্রখর রোদের মধ্যেও স্বর্গীয় অনুভূতিতে দেশের ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ১৯৭তম পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এবারের ঈদের জামাতে প্রায় ৭ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) সকাল ১০টায় অনুষ্ঠিত এই জামাতে ইমামতি করেন বড় বাজার মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আব্দুর রউফ। ১৭৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঈদগাহের ঐতিহ্য অনুসারে মুসল্লিদের প্রস্তুতির জন্য জামাত শুরুর ১৫ মিনিট আগে তিনটি, ১০ মিনিট আগে তিনটি এবং ৫ মিনিট আগে তিনটি শটগানের গুলি ছোড়া হয়।

প্রতিবারের মতো এবারও শোলাকিয়ায় দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাতে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ ছুটে আসেন। দেশের সর্ববৃহৎ এই জামাতে অংশগ্রহণ করতে সকাল থেকেই মুসল্লিদের ঢল নামে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত শোলাকিয়া ঈদগাহের মাঠে। মোবাইল ফোন, ছাতা, দাহ্য পদার্থ ও গ্যাসলাইটের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও লাখ লাখ মুসল্লি সমবেত হন শোলাকিয়া ঈদগাহে।

মাঠের সুনাম ও জনশ্রুতির কারণে ঈদের বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও সারা দেশের বিভিন্ন জেলা তথা ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, গাজীপুর, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, সিলেট, জামালপুর, খাগড়াছড়ি, শেরপুর, যশোর, খুলনা ও চট্টগ্রামসহ অধিকাংশ জেলা থেকে শোলাকিয়ায় মুসল্লিদের সমাগম ঘটে। এদের অনেকে ওঠেন হোটেলে, কেউ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে। আবার অনেকেই কোথাও জায়গা না পেয়ে রাত কাটান জেলা সদরের বিভিন্ন মসজিদে।

জামাত শুরুর আগে ঈদগাহ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ সমাগত মুসল্লিদের উদ্দেশে শান্তিপূর্ণ ঈদ জামাত আয়োজনে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ জানান। সেই সঙ্গে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, আমাদের হাওরে একটাই ফসল ধান। ফসল যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য আপনাদের (মুসুল্লি) কাছে দোয়া চাই। এবার সর্বকালের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রায় ৭ লাখের বেশি মানুষ এবারের ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার পরিবার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য আগত মুসুল্লিদের কাছে দোয়া চাওয়া হয়। বলেও জানান তিনি।

জেলা প্রশাসক ছাড়া পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ, পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ মুসল্লিদের ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রুবেল মাহমুদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ টি এম ফরহাদ চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাক সরকার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নূরে আলম, র‍্যাব-১৪ সিপিসি-২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের কোম্পানি অধিনায়ক স্কোয়াড্রন লিডার মো. আশরাফুল কবির, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আমিন হোসাইন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মনতোষ, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ঈদগাহ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু রাসেল, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাকিবুল ইসলাম প্রমুখ।

জামাত শেষে ইমাম হাফেজ মাওলানা শোয়াইব আব্দুর রউফ খুতবায় দেশ ও জাতির উন্নতি, সমৃদ্ধি এবং মুসলিম উম্মাহর সংহতি ও ঐক্য কামনা করেন। তিনি কেয়ামত পর্যন্ত যেন এই ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ থাকে তা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রাসেল শেখ বলেন, ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে মুসুল্লিদের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। মুসুল্লিদের নিরাপত্তায় ছিল ১ হাজার ১১৬ পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে পোশাকে ৮৮০ জন, সাদা পোশাকে ১৮৭ জন ও ট্রাফিকে ৪৯ জন অফিসার ফোর্স মোতায়েন ছিল। র‍্যাবের আটটি টিম (প্রতি টিমে ছয়জন করে) ও ৫ প্লাটুন বিজিবি সদস্য এবং এপিবিএন মোতায়েন ছিল। এ ছাড়া আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। ছিল ফায়ার সার্ভিসেরও বেশ কয়েকটি ইউনিট। দায়িত্ব পালন করছেন ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

পুলিশ সুপার বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ছিল ৩৪টি চেকপোস্ট। ঈদগাসহ আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণে বসানো হয়েছিল ৬৪টি সিসি ক্যামেরা। পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য বসানো হয়েছিল পুলিশ ও র‍্যাবের ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। পুরো মাঠ নজরদারির জন্য ড্রোন ওড়ে শোলাকিয়ায়। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে বসানো হয়েছিল ১৩টি আর্চওয়ে। ছিল ড্রোন ক্যামেরাও। মুসুল্লিরা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের দ্রুত চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য ছিল ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সসহ মেডিকেল টিম। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী স্বেচ্ছাসেবী ক্যাম্প। এদিকে উপমহাদেশের বৃহত্তম এই ঈদজামাতের জন্য সংস্কার করা হয়েছিল মিনার, অজুখানা। মুসল্লিদের প্রাকৃতিক কাজ-কর্ম সারার জন্য তৈরি করা হয়েছিল বেশকিছূ অস্থায়ী টয়লেট।

জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন শোলাকিয়া ঈদগাহের চেকপোস্টে হানা দেয় জঙ্গিদল। ঈদগাহ জামাতের ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদকে টার্গেট করে জঙ্গিদের এই হামলার পরিকল্পনা জীবনবাজি রেখে রুখে দেন লড়াকু পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের বুকের তাজা রক্তে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হয় শোলাকিয়ায় উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাত। ঈদগাহ ময়দানের অনতিদূরের জঙ্গি হামলা এড়িয়ে চার লাখ মুসল্লি শরিক হন সবচেয়ে বড় এই ঈদুল ফিতরের জামাতে। ওই বছর জঙ্গিরা হানা দেয়ায় এর পরের বছর থেকে নিয়মিত শোলাকিয়ার ঈদজামাতকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হয়। ঈদগাহ ময়দানকে ঘিরে গড়ে তোলা হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

জামাত উপলক্ষে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন চলাচল করে। ট্রেন দুটির একটি ভৈরব থেকে, অপরটি ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে কিশোরগঞ্জে যায় এবং নামাজ শেষে মুসল্লিদের নিয়ে ভৈরব ও ময়মনসিংহের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রতিষ্ঠা করেন হয়বতনগর জমিদার বাড়ির লোকজন। তাদের উত্তরাধিকারিদের একজন গবেষক সৈয়দ শাকিল আহাদ বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্বপ্রান্তে নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী এ শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাত। শোলাকিয়ার এ ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠা করেন হয়বতনগর জমিদার বাড়ির লোকজন। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ঈশাখাঁ’র ১৩ তম বংশধর হয়বতনগরের জমিদার দেওয়ান মান্নান দাদ খানের মা আয়েশা আক্তার খাতুনের অসিয়াত মোতাবেক ১৯৫০ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহের জন্য ৪.৩৫ একর জমি ওয়াক্ফ করেন। সেই ওয়াক্ফ দলিলে উল্লেখ রয়েছে, ১৭৫০ সাল থেকে এ মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

সে হিসাব অনুসারে শোলাকিয়া ঈদগাহের বয়স ২শ’ ৭৪ বছর। প্রতিষ্ঠার ৭৮ বছর পর ১৮২৮ সালে প্রথম বড় জামাতে এই মাঠে একসঙ্গে ১ লাখ ২৫ হাজার অর্থাৎ সোয়ালাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন। এই সোয়ালাখ থেকে এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা উচ্চারণ বিবর্তনে হয়েছে শোলাকিয়া। স্থানীয় হয়বতনগর সাহেব বাড়ির উর্ধ্বতন পুরুষ শাহ সুফি সৈয়দ আহমদ (র:) সে জামাতে ইমামতি করেন।

Comments

comments