অনিয়মের আখড়া উত্তরা ফিন্যান্স

7 days ago
6:45 pm
8
বাংলাদেশ অর্থ ও বাণিজ্য অনিয়মের আখড়া উত্তরা ফিন্যান্স

কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় থাকেন, তখন ভক্ষক লাভমান হলেও গ্রাহকরা থাকেন ঝুঁকিতে। উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের গ্রাহকরা সেই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের নথিপত্র গায়েব। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা পরিচালকরা ব্যক্তিগত স্বার্থে কোটি কোটি টাকা নিয়মবর্হিভূতভাবে উত্তোলন করেছেন। লেনদেনের প্রকৃত তথ্য গোপন করে উত্তরা ফিন্যান্স আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন পরিচালকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন থেকে জানা যায়, উত্তরা ফিন্যান্সের লেজার ব্যালেন্সে ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা ছাড় দেখানো হলেও আর্থিক বিবরণীতে ৩৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকার কোনও ব্যাখ্যা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী নগদ লেনদেনের সুযোগ না থাকলেও অনৈতিকভাবে চেয়ারম্যান নিয়েছেন বিপুল পরমাণ নগদ অর্থ। শুধু তাই নয়, এক টাকা আমান ছাড়াই ২৩৬ কোটি টাকার মেয়াদি আমানত টিডিআর ইস্যু করা হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠানের ট্রেজারি হেড মো. মাইনউদ্দীনের কাছে ২০০টি টিডিআর ইস্যুর বই পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার বা নথিতে এর কোনও হিসাব নেই। পরিদর্শনে উত্তরা ফিন্যান্সের ব্যাংক হিসাব থেকে ১১৮টি অনুমোদনহীন উত্তোলনের মাধ্যমে উত্তরা মোটরস ও উত্তরা গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ দেখিয়ে ৩৩৬ কোটি বের করে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উত্তরা ফিন্যান্সকে ১৯৯৫ সালে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়। যার প্রকৃত তথ্য ইতোমধ্যে বেরিয়ে এসেছে। ২০১৯ সালে কলমানি থেকে উত্তরা ফিন্যান্সের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৩৯৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা দেখানো হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে মাত্র ১৬ কোটি টাকার তথ্য পাওয়া গেছে। কলমানি থেকে নেওয়া ৩৮১ কোটি৫৯  লাখ টাকার কোনও তথ্য নেই। কলমানি, লেজার ব্যালেন্সে অর্থ নয়ছয় করা ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) গাড়ি, বাড়ি ও বিদেশ ভ্রমণে ২৪ কোটি টাকা নিয়েছেন। এভাবে একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান চলতে থাকলে কিছু দিনের মধ্যেই দেউলিয়া হয়ে যাবে।

ব্যবস্থাপনা ব্যয় নামে উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের এমডি শামসুল আরেফীন ২৪ কোটি ২২ লাখ টাকা নিয়েছেন। এই তথ্যও ব্যাংকের আর্থিক বিবরণীতে উল্লেখ নেই। আবার তার নামে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনও ঋণও নেই।

উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ওপর পরিদর্শন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরা দেখতে পেয়েছে যে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকেরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া বিপুল পরিমাণ ঋণ বের করে নিয়েছেন। আবার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি) গাড়ি-বাড়ি কিনতে অনুমোদন ছাড়া ঋণ নিয়েছেন। অনিয়মের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক উত্তরা ফিন্যান্সের ২০১৯ ও ২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদন সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে পাওয়া আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে লিখিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জবাব দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। সেখানে উত্তরা ফি ফান্যান্সের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, করোনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তার (সিএফও) হঠাৎ মৃত্যুর কারণে কিছু লেনদেনের নথিপত্র খুঁজে পেতে সমস্যা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সেগুলো খুঁজে বের করে জমা দেওয়া হয়েছে।

উত্তরা ফিন্যান্সের সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির বড় ধরনের কেলেঙ্কারি রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের কাছে উত্তরা ফিন্যান্স যেসব তথ্য উপস্থাপন করেছে সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবে কোনও মিল নেই।

উত্তরা ফাইন্যান্সের ২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চেন্ট ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের মার্জিন ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এরমধ্যে কোনও ধরনের অনুমোদন ছাড়া ৩৫০ কোটি টাকা জমা হয়েছে উত্তরা ফাইন্যান্সের বিভিন্ন পরিচালকের ব্যাংক হিসাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা উত্তরা ফাইন্যান্স পরিদর্শনে দেখেছেন, প্রতিষ্ঠানটির এমডি এস এম শামসুল আরেফিন কোনো অনুমোদন ছাড়াই ব্যবস্থাপনা ব্যয় শিরোনামে ২৪ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এর মধ্যে এমডির পক্ষে সাউথ ব্রিজ হাউজিংকে ৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা, বে ডেভেলপমেন্টকে ১ কোটি টাকা, ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে ডিএইচএসকে ৫০ লাখ টাকা ও উত্তরা মোটরসকে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এমডির টাকা উত্তোলনে প্রতিষ্ঠানটির কোনো ধরনের অনুমোদন ছিল না। এর বাইরে উত্তরা মোটরস ও উত্তরা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ৩৩৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো অনুমোদন নেই। তবে উত্তরা ফাইন্যান্স বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যে ব্যাখ্যা পাঠিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকটে পড়ে তারল্যসংকট মেটাতে উত্তরা গ্রুপ থেকে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছিল। পরে সেই অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মুজিবুর রহমান ব্লু চিপস সিকিউরিটিজের কর্ণধার। এই প্রতিষ্ঠানের ২৩৬ কোটি টাকা আমানত জমা করা হয়েছে। তবে এর বিপরীতে কোনো বৈধ নথিপত্র সংরক্ষণ নেই। ফলে আদৌ এই টাকা জমা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়। যদি কোনো ব্যাংক এই আমানতের বিপরীতে ঋণ দেয়, তার পুরো দায় উত্তরা ফাইন্যান্সের ওপর বর্তাবে।

উত্তরা ফাইন্যান্স নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সারমর্ম টেনে প্রতিবেদনে বলেছে, লেনদেনের প্রকৃত তথ্য আড়াল করে উত্তরা ফাইন্যান্স আর্থিক প্রতিবেদন তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছেন। তবে উত্তরা ফিন্যান্সের বক্তব্য হচ্ছে- কোম্পানির পক্ষ থেকে পরিদর্শক দলের কাছে এসব অনিয়মের দায়ভার চাপানো হয়েছে উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) উত্তম কুমারের ওপর, যিনি সম্প্রতি মারা গেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করতে সব অনিয়মের দায়ভার মৃত উত্তম কুমারের ওপর চাপানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসা বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা ফাইন্যান্সের এমডি এস এম শামসুল আরেফিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা আমাদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিটি বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছি। আমাদের সিএফওর হঠাৎ মৃত্যুর কারণে কিছু নথিপত্র খুঁজে পেতে ও দীর্ঘদিনের পুরোনো হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে মেলাতে পারিনি। এখন আমরা বেশির ভাগ নথি খুঁজে বের করেছি। সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমাও দিয়েছি। যেহেতু বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনাধীন, তাই এ নিয়ে আমি বিস্তারিত কিছু বলতে চাচ্ছি না। তবে এটুকু বলতে পারি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের কোনো অনিয়মের ঘটনা ঘটেনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ আরটিভি নিউজকে বলেন, উত্তরা ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডসহ দেশের অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে নাজুক অবস্থা। এসব বিষয়ে আমরা যারা আলোচনা করছি, এতে লাভ হচ্ছে না। যারা অনিয়ম ও দুর্নীতি করার দরকার তারা এসব আলোচনা বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেন না।

নিরীক্ষকদের সংগঠন দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি দেওয়ান নুরুল ইসলাম বলেন, উত্তরা ফিন্যান্সে যা ঘটেছে, তা নিরীক্ষকদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এরপরও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কোনো আপত্তি তোলেনি। হতে পারে এতে যোগসাজশ ও ব্যর্থতা ছিল। বাংলাদেশে নিরীক্ষকদের স্বাধীনতা আছে। তবে সবাই তা ধরে রাখতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে সময় কম দেওয়া হয়। এতে আর্থিক খাতের বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।