দুর্বলতা আড়াল করার বাজেট

1 week ago
2:42 pm
8
বাংলাদেশ অর্থ ও বাণিজ্য দুর্বলতা আড়াল করার বাজেট

“করোনাভাইরাসের (কভিড-১৯) প্রভাবে এক বছরের বেশি সময় ধরে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি। এর মধ্যে গত মার্চে আঘাত হানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। এতে নতুন করে গতি হারিয়েছে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বাড়ছে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার। করোনায় কর্মহীন হয়ে বিদেশ থেকে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন অনেক প্রবাসী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে এক বছর দুই মাসের বেশি সময় ধরে।

করোনা পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক না হওয়ায় সীমিত পরিসরে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এ অবস্থায় ঘোষণা করা হলো ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। যদিও বাজেটে করোনায় বিপর্যস্ত বিভিন্ন খাতের দুর্বলতা সযতনে এড়িয়ে গেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এমনকি করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বাজেটে নেই নতুন কোনো ঘোষণা। অথচ এ বছরের বাজেটের প্রতিপাদ্য রাখা হয়েছে ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’।

২০০ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতানুগতিকভাবে বিগত দিনের সাফল্যের কথাই বেশি বলে গেছেন। পাশাপাশি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বর্ণনা তুলে ধরেছেন তিনি। আর করোনার প্রভাবে অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার কথা তুলে ধরলেও তা থেকে উত্তরণের সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা তুলে ধরেননি অর্থমন্ত্রী।… পাশাপাশি এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরলেও কীভাবে তা মোকাবিলা করবেন তাও জানাননি অর্থমন্ত্রী।

বাজেট বক্তব্যের শুরুর দিকে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে বিগত ১২ বছর ধরে যে গতিতে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধিত হয়েছে, তাতে দেশে উন্নয়নে একটা ধারাবাহিকতার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি আমাদের ওপর আঘাত হানে, যা অদ্যাবধি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর ঝুঁকি তৈরি এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে।’’ যদিও কীভাবে এ বাধা কাটিয়ে ওঠা যাবে, তা মন্ত্রী পরিষ্কার করেননি। বরং তিনি বলেন, ‘’আমরা দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’’

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ”কভিড-১৯-এর দীর্ঘতর প্রভাব এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আর কভিডের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে সৃষ্ট ক্ষতি হতে পুনরুদ্ধারের কৌশল তুলে ধরতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ”কভিড-১৯-এর প্রভাব মোকাবিলায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ব্যবস্থা প্রস্তাবিত বাজেটে রাখা হয়েছে। তবে পুরো বাজেট বক্তব্যে কোথাও তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেননি।”

* রাজস্ব ঘাটতি: চলতি অর্থবছর রেকর্ড ঘাটতির পরও আগামী অর্থবছরের জন্য তিন লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা আদায় করা হবে। তবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিতে আগামী অর্থবছর কীভাবে এতটা রাজস্ব আদায় হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা দেননি মন্ত্রী। যদিও চলতি অর্থবছর ১০ মাসেই এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকা।

* বাজেটের আকার: চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার ছিল পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তবায়ন ঘাটতিতে তা কমিয়ে পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। করোনার মধ্যে অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলেও আগামী অর্থবছরের জন্য ৬৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে বাজেটের আকার। এতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ তিন হাজার ৬৮১ কোটি টাকা।

সূত্রমতে, চলতি অর্থবছর উন্নয়ন বরাদ্দ (এডিপি) ছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। তবে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। তবে উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ব্যয়ের সিলিং বেঁধে দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এরপরও আগামী অর্থবছরের জন্য উন্নয়ন বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা।

বিশাল এ বাজেট বাস্তবায়নের জন্য রেকর্ড দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে এ ঘাটতি ব্যবস্থাপনায় নেই সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা। এক্ষেত্রে ঘাটতি মেটাতে আগামী অর্থবছরের জন্য ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। যদিও ব্যাংক থেকে চলতি অর্থবছর ৫ মে পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ৩০ হাজার ১৮২ কোটি টাকা। আবার আগামী অর্থবছরের জন্য সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছর মার্চ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়েছে ৮৫ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে তা এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ব্যবহারে বরাবরই পিছিয়ে থাকলেও আগামী অর্থবছরের জন্য এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে।

* প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাক্সক্ষা: করোনার প্রভাব দ্রুত কেটে যাবে এমনটি আশা না করলেও চলতি অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির সংশোধিত প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলেন, “২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে করোনাভাইরাসের কারণে তা হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশ দাঁড়ায়। মহামারির প্রভাব দীর্ঘতর হওয়া এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এবং পুনরায় লকডাউন ঘোষণার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্লথ অবস্থা বিরাজ করছে এবং রপ্তানি ও আমদানির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত গতি ফিরে পায়নি। তবে আগামী অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রী ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তবে এ প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হবে তা পরিষ্কার করেননি তিনি।”

* ভ্যাকসিন নিয়ে লুকোচুরি: করোনা ভ্যাকসিনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে দেশের জনসংখ্যার ২০ শতাংশ তথা ৩ কোটি ৪০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়া যাবে। চীন ও রাশিয়ার সরকার, যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও ফ্রান্স/বেলজিয়ামভিত্তিক সানোফি/জিএসকের কাছ থেকে ভ্যাকসিন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ভারত থেকে ভ্যাকসিন কেনা হলেও এখন তা সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি তিনি তুলে ধরেননি।

* শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের চিত্র গোপন: করোনার কারণে গত বছর ১৭ মার্চ থেকে সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। কবেনাগাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অথচ অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে উল্টো যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “অনলাইনে ও টেলিভিশনে পাঠদান কার্যক্রম চলছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইনে ২৯ লাখ ৯ হাজার ৮৪৪টি ক্লাস আয়োজন করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বৃদ্ধি, ঝরে পড়ার হার বহুলাংশে হ্রাস এবং নিয়মিত উপস্থিতির হার বৃদ্ধি পেয়েছে।”

এদিকে করোনায় দেশের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র সামনে চলে আসে। তবে অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশংসা করে বলেন, “বাংলাদেশের সব নাগরিকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। মানসম্মত স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও পরিবার কল্যাণ সেবা প্রদান (এইচএনপি) উন্নয়নে এরই মধ্যে প্রশংসনীয় অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। দ্রুততম সময়ে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

* দারিদ্র্য ও বেকারত্ব গোপন: বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সমীক্ষায় দেখা গেছে, করোনার কারণে দেশে নতুন করে দুই কোটির বেশি মানুষ দারিদ্র্য হয়েছে। তবে বেকারত্ব বেড়ে ৩৫ শতাংশ হয়েছে। তবে বাজেটে এ বিষয় সরাসরি গোপন করা হয়েছে। বরং অর্থমন্ত্রী বলেন, “ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে আইটি খাতে এরই মধ্যে ১০ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে আরও ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। আর দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।”…

করোনার কারণে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান হারিয়ে দেশে ফেরা ও দেশে এসে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার বিষয়টিও অর্থমন্ত্রী গোপন করে গেছেন। বরং তিনি বলেন, করোনার মাঝেও ২১ হাজার ৯৩৪ জন বাংলাদেশি নারী কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে।

* প্রণোদনায় লুকোচুরি: বেসরকারি এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে, করোনায় প্রণোদনা পায়নি ৬৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। তবে অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ৫০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল সম্পূর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতার শেষ দিকে বলেন, “জাতীয় বাজেটে সাধারণত আমরা সুসংসত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার উন্নয়ন রূপরেখা প্রণয়ন করে থাকি। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারির কারণে এ বছরও সব তথ্য-উপাত্ত পরিপূর্ণভাবে আমাদের সামনে নেই। তবে আমাদের এবারের বাজেটেও দেশ ও জাতির উন্নয়নের পাশাপাশি প্রাধিকার পাচ্ছে দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষ-প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবন-জীবিকা। যদিও সাধারণ মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা নিয়ে বাজেটে অর্থমন্ত্রী তেমন কিছুই বলেননি।”…