অনিয়মে মেয়র হলেন আওলাদ খান; চুপ থাকলেন ওসি, জনমনে ক্ষোভ

2 days ago
2:27 pm
32
দেশজুড়ে ঢাকা অনিয়মে মেয়র হলেন আওলাদ খান; চুপ থাকলেন ওসি, জনমনে ক্ষোভ

মাদারীপুরের শিবচর পৌরসভা নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র হলেন আওলাদ হোসেন খান। অভিযোগ আছে, হলফনামায় তথ্য গোপন ও ভুল তথ্য দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও কোন প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই রিটার্নিং কর্মকর্তা ও শিবচর উপজেলার নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান মেয়র আওলাদ হোসেন খানকে বেসরকারি ভাবে মেয়র ঘোষণা করেন। এ নিয়ে সমলোচনার ঝড় ওঠেছে।

নির্বাচন কমিশনের সূত্র জানায়, হলফনামায় ৩খ ধারায় অতীতে দায়েরকৃত ফৌজদারী মামলা বা মামলাসমূহ এবং তার ফলাফলের বিবরণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এখানে আওলাদ খান অতীতে মামলাগুলো প্রযোজ্য নয় বলে উল্লেখ করেন। তবে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র বলছেন, ২০০৮ সালে শিবচর পৌর সুপার মার্কেটের আদায় করা ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মেয়র পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় আওলাদ খানকে। এ ঘটনায় মামলা হলে তিনি জেলের ঘানিও টানেন। যা হলফনামায় উল্লেখ করেননি। বিষয়টি পুরোটাই এরিয়ে গেছেন এই প্রার্থী। মামলার তথ্য গোপন করার ফলে মেয়র পদের তার প্রার্থীতা বাতিল হবার কথা। কিন্তু রিটার্নিং কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে বিনাপ্রতিদ্বন্দীতায় তাকে মেয়র হিসেবে ঘোষাণা দিয়েছেন। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিন শিবচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিরাজ হোসেন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ওসি নিজে হাতে ধরে মনোনয়নপত্র আওলাদ খানের সাথে জমা দেন। তবুও থানা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা মামলার বিষয়ে কিছুই বলেননি। কিংবা আপত্তিও জানাননি। যা দায়িত্ব অবহেলার সামিল বলে গণ্য হয়।

এছাড়া মেয়র পদে প্রার্থীতার জন্য আওলাদ হোসেন খান তার হলফনামায় খান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ভুসি মালের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কথা উল্লেখ করেন। যার ঠিকানা দেয়া হয়েছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার গুয়াতলা বাহেরচর। কিন্তু বছরে তিনি এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে কত টাকা আয় করেন কিংবা কত টাকা তার ব্যয় কিছুই হলফনামায় উল্লেখ করেননি। ফলে সরকারকে তিনি বড় অংকের আয়কর (ইনকাম ট্যাক্স) ফাঁকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে, সরকার মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এদিকে এই মেয়র প্রার্থী তার হলফনামায় নগদ টাকার পরিমাণ দেখিয়েছেন মাত্র ১০ হাজার টাকা। আর ব্যাংকে জমাকৃত টাকার পরিমাণ দুই লাখ টাকা। তবে, এটি কোন ব্যাংকে এই দুই লাখ টাকা জমা রয়েছে তার কোন ব্যাংক স্টেটমেন্ট হলফনামার সাথে জমা দেননি। ফলে ব্যাংকে কতটাকা জমা আছে তাও রয়েছে অন্ধকারে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছেন আওলাদ খান বর্তমান মেয়র। তার একাধিক ব্যাংক এ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা রয়েছে। তার পরিবারের একাধিক সদস্যদের ব্যাংকেও রয়েছে কোটি কোটি টাকা। যা সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে অনুসন্ধান করলেই বেড়িয়ে আসবে আসল তথ্য। এসব তথ্য, হলফনামায় গোপন করেছেন তিনি। ফলে, আওলাদ হোসেন খানের মেয়র প্রার্থীতা বৈধ করা নিয়ে রয়েছে কৌতুহল আর নানা প্রশ্ন।

হলফনামাতে তিনি এইচএসসি পাশ লিখেছেন। অথচ, পাশের কোন সার্টিফিকেট তার সাথে জমা দেননি। এদিকে তিনি শিবচর পৌরসভার মেয়র হিসেবে গত ৫ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ, পৌরসভায় থেকে তিনি কি পরিমান সম্মানী-ভাতা পান তাও হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেননি। বিধি মতে, একজন প্রার্থীর হলফনামায় একটি ভুল বা কোন একটি তথ্য গোপন করলে সেই প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যাবার কথা। কিন্তু আওলাদ হোসেন খান এতো তথ্য গোপন করার পরও একজন মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রার্থীতা কিভাবে মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে এটা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের মাঝে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোপ। এই সবকিছুই শিবচর পৌর নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা মো. মিরাজ হোসেন, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হারুণ অর রশীদের জোগসাসোজে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী তুলেছেন সচেতন মহল।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিবচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মিরাজ হোসেন বলেন, মেয়র প্রার্থী আওলাদ হোসেন খান তিনি কোন মামলার আসামী ছিলেন কিনা এটা আমার জানা নেই। মূলত পেছনের রেকর্ড পর্যালোচনা করে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই, মনোনয়নপত্র ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়নি।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শিবচর পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মনোনয়নপত্র যাছাই-বাছাই করে মেয়র প্রার্থী আওলাদ হোসেন খানের তেমন কোন ভুল পাওয়া যায়নি। এজন্য তার প্রার্থীতা বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। যদি তিনি কোন তথ্য গোপন করে তাহলে প্রধান নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, কোন প্রার্থী যদি তার হলফনামায় কোন ধরনের তথ্য গোপন করে থাকেন তাহলে তার প্রার্থীতা বাতিল বলে গণ্য হয়। শিবচর পৌরসভার মেয়র প্রার্থী আওলাদ হোসেন খান যদি হলফনামায় ভুল তথ্য বা কোন তথ্য গোপন করেন তাহলে তার বিরুদ্ধে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হবে। এছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলা ছিল কিনা সে বিষয়েও পদক্ষেপ নেয়া হবে।

মাদারীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, হলফনাফায় তথ্য গোপনের বিষয় যদি প্রমাণ হয়, সেই বিষয়টি নির্বাচন কশিমনের নজরে আসলে ওই প্রার্থীর গেজেট প্রকাশ হবে না। এ ব্যাপারে বিধি রয়েছে। প্রার্থী কাগজপত্র জমা দেয়ার পর যাছাই-বাছাই করার দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তার। যদি তিনি সঠিকভাবে এসব কাগজপত্র যাছাই-বাছাই না করে প্রার্থীর বৈধতা ঘোষণা করেন, সেটার দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তা এড়াতে পারেন না।

এদিকে আওলাদ হোসেন খানের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দিলে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্যস্ততা দেখিয়ে পরে কথা বলবেন বলে ফোন কেটে দেন। এরপর টানা তিনদিন একাধিকবার তার ফোনে কল দিলে তিনি আর রিসিভ করেননি।

উল্লেখ, আওলাদ হোসেন খান শিবচর পৌরসভা নির্বাচনে (২০২১) আওয়ামী লীগ থেকে মনোনীত হন। এই নির্বাচনে অন্যকোন প্রার্থী মেয়র পদে মনোনয়নপত্র জমা না দেয়া তার আওলাদ হোসেন খানের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে রিটার্নিং কর্মকর্তা তাকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করেন।