বসন্তবরণে নারিকেল জিঞ্জিরায় কুবির বাংলা পরিবার

8 months ago
10:06 pm
119
ফিচার ভ্রমণ বসন্তবরণে নারিকেল জিঞ্জিরায় কুবির বাংলা পরিবার

বছরের শুরুই বলা যায়। জানুয়ারি মাস পেরিয়ে এলো ফ্রেবুয়ারি। সাধারণত এই সময়ে শিক্ষাসফর বা ট্যুর যাই বলা হোক না কেন একটু বেশিই লক্ষ্য করা যায় । কেননা, এই সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার চাপ তুলনামূলকভাবে নেই বললেই চলে। আর এই সময়কে কাজে লাগিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ আয়োজন করল একটি শিক্ষাসফরের। স্থান নির্ধারন করা হল সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপ। ‘বসম্ত ভালোবাসায় নারিকেল জিঞ্জিরায়’ এই শ্লোগানকে সামনে নিয়ে রাত সাড়ে দশটায় ক্যাম্পাস থেকে সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে শুরু হল আমাদের যাত্রা। বাংলা বিভাগের শিক্ষক – শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা- কর্মচারী এবং তাদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে আমরা ছিলাম মোট ৮৮ জন। আমাদের বাসগুলো চলছে ঢাকা – চট্টগ্রাম মহাসড়কে যেন এক কালচে পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ করে শান্ত বাস যেন মূহুর্তেই অশান্ত হয়ে উঠলো কেননা বাসে শুরু হয়ে গেল শিক্ষার্থীদের গান ও নাচের আসর। এতে বাদ পড়েনি শিক্ষক ও কর্মচারীরাও। এভাবে নাচ ও গান বাজনার মধ্যদিয়ে রাত ১.৫০ মিনিটে আমরা পৌঁছে গেলাম চট্টগ্রামে। সত্যি কথা বলতে গান বাজনা ও নাচানাচিতে আমরা এতই মগ্ন ছিলাম যে কখন যে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছালাম বুঝতেই পারলাম না। আমাদের খাওয়া-দাওয়া ও আনুষাঙ্গিক কাজের জন্য কেনো এক হোটেলে যাত্রা বিরতি দেয়া হল। আনুমানিক ২০ মিনিট বিরতির পর আমাদের যাত্রা আবার শুরু হল। এবার যেন অনেকের চোখেই ঘুমের ঝাপসা ভাব দেখা যাচ্ছে। কনকনে শীতের মধ্যে আমিও চাদর গায়ে দিয়ে নিদ্রায় গেলাম। যাত্রা পথে ঘুম ভাঙ্গে আবার আসে । যাই হোক সকাল ৬ টায় আমার ঘুম পুরোপুরি ভাঙ্গে। ততক্ষণে আমরা কক্সবাজার পেরিয়ে টেকনাফের কাছাকাছি। সকাল ৭.৪০ এ আমরা টেকনাফ এসে পৌঁছালাম। আমাদের নাস্তা ও হালকা গল্পগুজব শেষে সকাল ৯ টার আগেই জাহাজে উঠে গেলাম। জাহাজ ছাড়লো ৯.৩০ টায়। শুরু হল সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্য যাত্রা। চারপাশের প্রকৃতি ও পাহাড়গুলো দেখে যেন চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে গাংচিলের ছোটাছুটি দেখে সকলের ভ্রমণক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। জাহাজ চলছে। আমরাও জাহাজের এদিক থেকে ওদিক ছোটাছুটি করছি প্রকৃতি ও সমুদ্রকে কাছে থেকে বিশ্লেষণ করার জন্য। দুপুর ১২ টায় আমরা পৌঁছে গেলাম প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে। এ যেন সৃষ্টিকর্তার তৈরি এক অপরূপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি। রিসোর্টে আসলাম। দুপুরের খাওয়া- দাওয়ার পর শুরু হয়ে গেল আমাদের হলুদ সাজে সাজার প্রচেষ্টা। কেননা এই দিন বিকেলে আমরা সাগর পাড়ে এসে সবাই যেন হলুদের এক মিলনমেলার মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করে নিলাম। পুরো বিকেল থেকে শুরু করে রাত ৯ টা পর্যন্ত আমরা ঐখানেই ছবি এবং গল্পগুজবের মাধ্যমে সময় কাটালাম। পরে রিসোর্টে এসে সবাই খাওয়া- দাওয়া করে যে যার মতো রুমে চলে আসলাম।

পরের দিন সকালে সূর্য উদয়ের যেন এক অপরূপ সাক্ষী হল আমাদের বাংলা বিভাগ। ভালোবাসা দিবসের সাথে প্রকৃতিকেও যেন আমরা ভালোবেসে ফেললাম। সমুদ্রের তীরে কিছুক্ষণ হল হাঁটাহাঁটি তারপর সোজা চলে এলাম ঘাটে। সেখান থেকে ট্রলার যোগে চলে গেলাম অপরুপ সৌন্দর্য ও প্রবালে ঘেরা ছেঁড়াদ্বীপে। সাগরের প্রচন্ড টেউ আছড়ে পড়ছে এ প্রবালগুলোর ওপর। সমুদ্রের শা শা আওয়াজ যেন মনে এক অন্য ধরনের তৃপ্তি এনে দিল। এ যেন প্রকৃতির এক অপরূপ নিদর্শন। সেখান থেকে দুপুরের দিকে আমরা রিসোর্টে চলে এলাম। খাওয়া – দাওয়ার পর স্যারসহ চলে গেলাম সাইকেল ভ্রমণে। এ যেন আমার জীবনের স্মরণীয় একটি সাইকেল ভ্রমণ। সমুদ্রের তীর ঘেষে আমরা ১৯ জন এগিয়ে চললাম সামনের দিকে। যদিও কেউ কেউ ক্লান্ত হয়ে মাঝ পথ থেকে ফিরে আসে। ১.৩০ মিনিট সাইকেলিং করার পর পুরো দ্বীপটি যেন আমাদের কাছে চিরচেনা হয়ে গেল। এভাবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল সূর্যাস্তের মাধ্যমে। তারপর খানিক কেনাকাটা শেষে আমরা আবার রিসোর্টে আসলাম। রাতের খাওয়া- দাওয়ার পর শুরু হয়ে গেল আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও র‍্যাফেল ড্র। শিক্ষক – শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ নিজ গান, নাচ, কবিতা- আবৃত্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে পুরো রিসোর্ট অঙ্গনকেই যেন অন্যরূপ দান করে। প্রথম পুরষ্কার পায় আমাদের বিভাগের একজন ম্যাম।


শেষের দিন সকালে আমরা নাস্তা করার পর সবাই চলে যাই সমুদ্র পাড়ে। সেখানে লাফালাফি ঝাপাঝাপি ও ফটোশুটের মাধ্যমে আমরা যেন পুরো অঙ্গনকেই জমজমাট করে ফেলি। আমরা যেন সাগরের ঢেউয়ের সাথে এক অন্যরকম আনন্দ খুঁজে পাই। সেখানে চলে কিছুক্ষণ ফুটবল খেলা। তারপর সেখান থেকে রিসোর্টে এসে ভেজা কাপড়গুলো পরিবর্তন করে চলে আসার প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। সত্যি কথা বলতে সেই মূহুর্তে কেন জানি উৎফুল্ল মনটা শান্ত হয়ে গেল। কেমন যেন এই দ্বীপের প্রতি এক অন্যরকম মায়া ও ভালোবাসার সৃষ্টি হয়ে গেল। জাহাজ ঘাট থেকে ছেড়ে দিলো। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম এই দ্বীপের দিকে। তখন আমার মনে বাজে এক সুর,’ ছেড়ে যেতে চাই না তবুও ছেড়ে যেতে হয়।’

রাজেক হাসান
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়