খোকার ঐতিহ্যের কুরবানী ঈদ

3 months ago
8:33 pm
25
সাহিত্য খোকার ঐতিহ্যের কুরবানী ঈদ

ফজরের নামায পড়ে ঘরে ঢুকল আমির। বাবাকে দেখে সালাম জানিয়ে কোলে গিয়ে বসলো। বাবা কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কণ্ঠে আমীর বলল, বাবা জানো, আফিফা ও আকিফা খুব কান্না করছিলো। কান্নার মাঝেও ওরা কী সুন্দর হাসে!

আচ্ছা আব্বু! কুরবানীর ঈদ কবে? আমি না স্বপ্নে দেখেছি, আজ কুরবানীর ঈদ! বলুন না আব্বু, ঈদ কবে? আব্বু বললেন, এই তো জিলকদের পনের দিন গেল। আরো পনের দিন পর আসবে যিলহজ্ব মাস। যিলহজ্ব মাসে ঈদ হবে। উফ! কবে আসবে যিলহজ্ব মাস! তার যে আর সইছে না। নাস্তা খেয়ে আমীর প্রতিদিনের মতো তাঁর পত্রিকার কাজে বেরিয়ে গেলো। প্রতিদিন সে দিন গুণতে থাকে। ত্রিশ যিলকদে তার খুশীর শেষ নেই। আজ যিলহজ্জের চাঁদ উঠবে।

সন্ধ্যায় আব্বুর সাথে ছাদে গিয়ে চাঁদ দেখল সে। চাঁদ দেখে এসে তার কী আনন্দ! কাল ঈদ, কাল ঈদ বলে লাফালাফি শুরু করে দিল। আব্বু আদর করে আমীরকে কোলে টেনে নিলেন।

বাজান! যিলহজে¦র ১০ তারিখে কুরবানীর ঈদ হয়। কাল তো এক তারিখ। আর নয় দিন পরে ঈদ হবে। শুনে আমীরের যেন আরো কান্না পেল। তার এতদিনের প্রতীক্ষা…!

কী আর করা, যা বাস্তব তা তো মেনে নিতেই হবে। কষ্ট করে না হয় আরো কটা দিন অপেক্ষা করবে। দিন তো নয়, যেন একেকটি বছর। একেকটা দিন পার হয় আর আমীর গুণতে থাকে এক, দুই, তিন…।

আট তারিখ তাদের প্রতিষ্ঠান ছুটি হল।
সম্পাদক বললেন, নয় যিলহজ্ব ফজর থেকে তের যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাযের সালাম ফিরিয়েই সবাইকে একবার করে তাকবীরে তাশরীক পড়তে হবে। তাকবীরে তাশরীক হল- (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার,লাইলাহা ইল্লাল্লাহু,অল্লাহু আকবার,আল্লাহু আকবার,ওলিল্লাহিল হামদ) এই দিনগুলোকে ‘আইয়ামুত তাশরীক’ বলে।

বাসায় এসে সে আব্বুকে দেখল ¤্রয়িমান অবস্থায়। আব্বু ছোট্ট একটি চাকুরী করতেন। সেই মাইনে দিয়ে তাদের সংসার চলে। প্রতি বছর বেতনের সঞ্চিত কিছু টাকা জমিয়ে রাখা হলে তা দিয়েই কুরবানী দেন হক সাহেব। কিন্ত এবারে পেনশনে গিয়ে সকল টাকা দিয়ে জমি বন্ধক নিয়েছেন। জমির ফসলও তেমন হয়নি। এরই মাঝে দেশে করোনা পরিস্থিতিতে জমানো টাকাও খরচ করে ফেলেছেন পরিবারের জন্য। এসব বিষয়ে চিন্তা করছিলেন হক সাহেব।

এ মুহুর্তে আমীর এসে বাবার কাছে গিয়ে বসলো, আচ্ছা বাবা তোমার চোখের কোনে পানি কেনো? কি হয়েছে তুমার, নারে বাবা কিছু হয়নি। করোনার পরিস্থিতিতে এমনিতেই মানুষ সংকটে তার পরে আবার ভারী বর্ষনে পানি বেড়ে বন্যার পদধ্বনি শুনা যাচ্ছে। এমন সংকটকালে কি করে কুরবানী দেই। বড় হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি বাবা ও দাদারা কুরবানী দিয়ে আসছে। ঐতিহ্যের কুরবানীর ধারাবাহিকতা বুঝি আর থাকছে না?

আচ্ছা বাবা তুমার এসব চিন্তে করতে হবে না। আমার অফিসের সম্পাদক স্যার পুরো এক বছরের বিলের কমিশন দিয়েছে আমাকে। সে টাকাটা দিয়ে এবারের কুরবানীটা দাও না বাবা। খোকার এ কথা শুনে বাবার চোখের পানিটা আরও বেড়ে গেলো। বাবার বড় পোলা হয়েও সে এখনও খোকাই রয়ে গেলো। বাবার কাছে সন্তানরা আসলেই খোকা বুঝি? সেই ছেলে বেলা থেকে আমীর যেন সাদাসিদে সহজ সরল প্রকৃতির সুবোধ বালক। সারাদিন অতীত ঐতিহ্য সন্ধানে আর লিখালিখিতে ব্যস্ত। সংসারে দুজন নতুন অতিথি এসেছে তাদেরচে বেশি যেন লিখালেখি তাঁর সবচে বেশি আনন্দ পায়।

আচ্ছা বাবা চলো বেলা হয়ে গেলো আমাদের গরু কিনতে যাবে না? আব্বু বললেন, ইনশাআল্লাহ বাবা আজকেই আমাদের গ্রামের হাটে যাব।

আমীরের মেয়ে আকিফা ও আফিফারা বাড়ির ভেতরের খড়ের খের থেকে অনেকগুলো খর নিয়ে আসলেন। দু বোন মিলে গরুকে সেগুলো খাওয়াল। রাতে খুকিদের আম্মু ভাতের মাড় দিলেন গরুকে খাওয়ানোর জন্য। আব্বু খাইয়ে দাইয়ে গরুটিকে সুন্দরভাবে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। একটা কয়েলও জ্বালিয়ে দিলেন, মশা যেন না ধরে। হক সাহেব বললেন, কুরবানীর পশুর যত্ন করলে অনেক সওয়াব পাওয়া যায়। বাবার কথা শুনে আমীর যেন তার সব ব্যস্ততা ভুলে গেল। তার প্রিয় সখ গরু পোষা। গরুর যত্ন করে এখন অতিবাহিত হচ্ছে সারাবেলা। কখনো ঘাস খাওয়ায়, কখনো মাড় খাওয়ায়, কখনো পাতা দিয়ে মশা মাছি তাড়ায়।

দশ যিলহজ্ব সকালে ফজরের নামায আদায় করেই সে দৌড়ে গেল গরুর কাছে। আজ গরুটিকে কুরবানী করা হবে- একথা মনে হতেই তার মনটা কেমন যেন হয়ে গেল।
হক সাহেব আমীরকে ডাক দিলেন ঈদের নামাযের প্রস্তুতি নিতে। আমীর গোসল করল, পুরান জামা পরতে দেখে খুকির আম্মা বললো ঈদের দিনে নতুন জামা পড়তে হয়। আমীর বললো আমার কাছে ঈদ মানে বাবা মা ভাইদের আনন্দ। এবারের আনন্দটায় নতুন মাত্রা এনেছে দুটি খুকি। সন্তানদের মুখের হাসি যেন বাবার হাশি। খুকির মা বললো এমন মানুষ সমাজে বিরল যে কিনা নিজের প্রতি যত্নশীল না। পরিবারের প্রতি মনোযোগী। স্ত্রীর পিড়াপীড়িতে ওই যে আলমিরায় ইস্ত্রী করা জামাটা পরেই নামাজে যাচ্ছে আমীর।
ঈদগাহের পাশ ঘেশে যাওয়ার সময় তাঁর মনটা নড়ে ওঠলো। এই মাঠেই বাবার সাথে ছোট্টকাল থেকে নামাজ আদায় করে আসছে আর এবার করোনার প্রভাবে সরকারের নির্দেশনা মেনে মসজিদেই নামাজ আদায় করতে হচ্ছে। সবই আল্লাহর লীলাখেলা। এলাকার সকলকে নিয়ে গ্রামের বাড়ির পুরনো মসজিদে নামাজ আদায় করলো। নামাজের পর ইমাম সাহেব খুৎবা দিলেন। খুৎবায় ইমাম সাহেব বললেন কেউ কুলাকুলি করবেন না। নামাজ আদায় করে নিজ নিজ বাড়িতে সরকারী নির্দেশনা মোতাবেক কুরবানীর পশু জবাই করবেন বলেই দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে মোনাজাত ধরলেন।

ঈদের নামায শেষে কেউ আর দেরী করল না। কারণ, কুরবানীর পশু জবাই করতে হবে। আমীররা এক রাস্তা দিয়ে গিয়েছিল অন্য একটি রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে ফিরল। হক সাহেব ও শরীকদের নিয়ে গরুটিকে বাড়ির উঠানে নিয়ে আসলেন। মসজিদের ইমাম সাহেব ছুরি নিয়ে আসলেন।

লেখকঃ আমিনুল হক সাদী