করোনা কালীন মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব

3 weeks ago
10:54 pm
16
অন্যান্য খোলামত করোনা কালীন মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার গুরুত্ব

আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস, বাংলাদেশ এখনও করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। গড়ে ৩০-৩৫ জন নিয়মিতই মরছে। লোকজন জীবিকার তাগিদে নানাবিধ কাজে জড়িয়ে পড়লেও তাদের ভিতরে করোনা ভীতিটা একদম নাই তা বলা যাবে না । যাদের করোনা হয়েছিল তারা সুস্থ হয়ে উঠলেও নানারকম মানসিক সম্যসায় ভুগছে। অনেকেরই করোনালীন জন-বিচ্ছিন্নতা পেয়ে বসেছে। সমাজে বসবাসকারী প্রতিবেশীগণ যখন সামাজিক দূরত্বের নামে সামাজিক অবহেলা করছে তখন স্বভাবতই তাদের নানারকম মানসিক চাপে থাকতে হচ্ছে। যেহেতু একজন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যই নির্ধারণ করে তিনি কিভাবে চিন্তা করবেন, কিভাবে কোন জিনিসকে ব্যাখ্যা করবেন এবং সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিবেন। তাই যে কোনো মানসিক সমস্যা তা ব্যক্তিগত জীবনকে প্রভাবিত করবে এটাই স্বাভাবিক।

নারী, শিশু ও বয়স্কদের উপর বাড়তি নজর দিতে হবে। কারন তাদের সহ্য শক্তি অনেক কম। তাদের জন্য দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারন করতে হবে। দীর্ঘদিন সংস্পর্শ এড়িয়ে চললে শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হতে পারে ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমাতে পারে । আর বেশিরভাগ সংসারে নারীই প্রাথমিক এবং একমাত্র সেবাদানকারী। যে কোন সংকটে তার কাজের চাপ এবং মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এই করোনাকালীনও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

মহামারির সময় মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যাচ্ছে, চীনে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৫০ শতাংশ বিষণ্নতার রোগে, ৪৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে এবং ৩৪ শতাংশ ঘুম না আসার সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর কানাডার স্বাস্থ্যকর্মীদের ৪৭ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মহামারির প্রভাব ইতিমধ্যে মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তুলনায় চিকিৎসার আয়োজন ও চিকিৎসক কম। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে মহামারি শুরুর আগে দৈনিক গড়ে ৩০০ রোগী চিকিৎসার জন্য এলেও এখন তা অর্ধেকে কম বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ।

একদিকে মানসিক রোগীরা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকছে, অন্যদিকে করোনা নতুন মানসিক সমস্যা তৈরি করছে। করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে প্রায় ৯৩ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সেবা বাধাগ্রস্ত অথবা বন্ধ হয়ে গেছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর জরিপে উঠে এসেছে। সাময়িক সস্থীর আশায় অনেকে অ্যালকোহল এবং মাদকের ব্যবহার করছে। যা অনিদ্রা এবং উদ্বেগ মত সম্যসা বাড়িয়ে তুলছে। তাছাড়া কোভিড-১৯ নিজেই স্নায়ুবিক এবং মানসিক জটিলতা, যেমন প্রলাপ ও স্ট্রোকের কারণ।

পরিবার সদস্য, প্রিয়জন, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে শারীরিকভাবে মেলামেশা করা থেকে মানুষ দূরে থাকছে । এই ভয় দূর করে নতুন ব্যবস্থায় সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন বলে ধারণা করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা। এই করোনাকালে অনেকের মাঝেই অবসাদ, ভয়, দুশ্চিন্তা, ঘুম ও রুচির সমস্যা, বুক ধড়ফড় এবং সিদ্ধান্তহীনতার মত কিছু কমন সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যা সচেতন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

নিজে কিভাবে ভাল থাকবেন সে পথ খুঁজে নিতে হবে নানারকম সৃষ্টিশীল ও ভালো কাজের মধ্যে। প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। এটা আমাদের মন ও শরীর দুটোই ভাল রাখবে। নিজ সম্যসার কথা প্রিয়জনের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে ইতিবাচক বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। এটা বিশ্বাস করতে হবে যে মানসিক রোগ শারীরিক রোগের মতোই চিকিৎসাযোগ্য। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস যেমন পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং ঘুমের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। করোনা খুব সহসাই চলে যাচ্ছে না। হয়তো আরো অনেক দিন একে সাথে নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাড়িয়েছে।

লেখকঃ- আবু জাফর
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।