বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় সংগঠনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

5 months ago
11:28 pm
113
অন্যান্য কলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় সংগঠনের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

‘শাহজালাল ইউনিভার্সিটি স্পিকার্স ক্লাব’, শাবিপ্রবিতে আমার প্রাণের একটি জায়গা। বিশ্ববিদ্যায় জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় পথ হেঁটেছি যে নামটির সাথে সেটি হলো ‘শাহজালাল ইউনিভার্সিটি স্পিকার্স ক্লাব’। প্রথমে যখন আমি সংগঠনের সদস্যফর্ম নেই তখন জানতাম না ঠিক কি কি কারনে বা কেন এই সংগঠন করবো? কি লাভ হবে সংগঠন করে ? কিংবা সংগঠনটি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকে কতটা শাণিত করবে ইত্যাদি?

যেদিন থেকে সংগঠনের সদস্য হলাম ঠিক সেদিন থেকেই সিলেবাসের লেখাপড়ার বাহিরেও আরেকটা বাস্তব জ্ঞানের বই হাতে পেলাম। আজ আমার প্রাণের সেই সংগঠনটি ১৫ বছর পূর্ণ করলো। অসংখ্য স্মৃতি আজ মনের কোণ থেকে ভেসে আসছে কেবল মনে হচ্ছে যেন এই তো ক’দিন আগের কথা। সকল স্মৃতি হাতরে অসংখ্য প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির ভীড়ে আমার মনে হলো আজ কেবল প্রাপ্তিটুকুই বলতে ইচ্ছে করছে। কারন অনেক শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পার করে কেবল পাঠ্যবইকে আকড়ে ধরে।কিন্তু পাঠ্য বইয়ের বাহিরে সংগঠনগুলো যে বিরাট ভূমিকা পালন করে তা তাদের দৃষ্টি সামানার বাহিরেই থেকে যায়।তাই কেন , কি জন্য সংগঠন করা প্রয়োজন এবং কেমন সংগঠন করা উচিত সেই বিষয়েই আমি আলোকপাত করতে চাই।

আমরা সকলেই জানি প্রতিটি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে অনেকগুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। অনেক ছাত্র-ছাত্রী যুক্ত হয় এমন বিভিন্ন সংগঠনের সাথে।তবে প্রথম দিকে অনেক শিক্ষার্থীই মনে করেন, ক্লাব বা সংগঠনে কাজ করা মানে সময় নষ্ট, পড়ালেখার ক্ষতি। সত্যিই কি তাই?

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের কেন সংগঠনে যুক্ত হওয়া দরকার? কিংবা সহজ করে যদি বলি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা কেন সংগঠনে যুক্ত হবে? এর উত্তর আক্ষরিক অর্থে সহজ মনে হলেও এর বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তা কিন্তু ব্যপক।

মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠন করা ছাত্র-ছাত্রীরা অন্যদের চেয়ে আলাদা পরিচিতি বহন করে তাদের ইতিবাচক গুনাবলি, দায়িত্বশীলতা এবং নেতৃত্বগুণের মাধ্যমে। আমিও আমার নেতৃত্বগুনের একটা বড় অংশ অর্জন করেছি আমার প্রাণের সংগঠন শাহজালাল ইউনিভার্সিটি স্পিকার্স ক্লাব থেকে।কেবল একটি দিক নয় এই সংগঠনটি  নানাদিক থেকে দক্ষ হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে আমার জীবনে।

যে কোন বিষয় সম্পর্কে নিজের মতামত স্পষ্ট করে তোলে ধরা, যে কোন অনুষ্ঠানের বাজেট তৈরি করা, অনুষ্ঠানের জন্য ঘুরে ঘুরে স্পনসর জোগাড় করা ইত্যাদি নানা দিকের একটা প্রশিক্ষণ হয়ে যায় সংগঠন করার মাধ্যমে।আর এই সম্পূর্ণ কার্যক্রমটাই ঘটে অবচেতন মনে। তাছাড়া প্রতিটি ক্লাব বা সংগঠনের মৌলিক বিষয় কিন্তু একই। যেমন সবার মতামতকে শ্রদ্ধা করা, সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা, নিয়ম মেনে চলা, অনৈতিক কোন কাজ না করা এমনটাই বিশ্বাস করে সকল সংগঠনের সদস্যগন।

এখন আশা যাক পেশাগত জীবনে সংগঠন করার গুরুত্ব কি ? আমরা জানি এখন অধিক সংখ্যক চাকুরীর যোগত্যা যাচায়ে চাকুরী প্রার্থীর সাংগঠনিক দক্ষতাও দেখা হয়ে থাকে। যেমন প্রার্থীর নেতৃত্বগুণ আছে কি না, পাঠ্যবইয়ের বাইরে সামাজিক অন্য কোনো কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, যোগাযোগের দক্ষতা, মানুষকে বোঝানোর দক্ষতা এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এছাড়াও চাকুরীর ভাইভা বোর্ডে নার্ভাসনেস দূর করতে সাংগঠনিক দক্ষতাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, সংগঠন করলে সব সময় মানুষের সঙ্গেই কাজ করতে হয়, কথা বলতে হয়, বোঝাতে হয়, সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করাতে হয় যা পেশাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে আমি মনে করি।

সংগঠনের কাজে সময় দিতে গিয়ে কি পড়াশোনার ক্ষতি হয়? আমি আমার জায়গা থেকে আমার ব্যক্তিগত মতামত দিতে চাইলে বলবো কখনোই না। কারণ আমি যদি সব সময় সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করে চলার চেষ্টা করি তাহলে অবশ্যই লেখাপড়ার কোন ক্ষতি হবে বলে মনে করিনা। নিজের মতো করে সময় ভাগ করে নিলেই সময়ের ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ হবে বলে আমি মনে করি।

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য সংগঠন থাকে কিন্তু সকল সংগঠনই সকলের জন্য তা কিন্তু ঠিক নয়।ঠিক সেই বিষয়টিকে যদি এভাবে বলি যে কেমন সংগঠনে যুক্ত হব আমরা?

তাহলে আমি বলবো মূলত কে কী ধরনের সংগঠনে যুক্ত হবে, বিষয়টি একান্তই তার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে। কেউ বিতর্ক করবে, কেউ আলোকচিত্রী হবে, কেউ আবার মূকাভিনয় কিংবা রোবটিকস ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হবে। কেউ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব করবে, কেউ আবৃত্তির সংগঠন, কেউ সঙ্গিত করবে, কেউ নাটকের দল করবে এভাবেই নানা দিকেই মানুষের আকর্ষণ থাকতে পারে।মূলত যে সংগঠন আমাদের পরিবার, ধর্ম, সমাজ সর্বোপরি দেশের জন্য সাংঘর্ষিক নয়, নিশ্চয়ই এমন সংগঠনেই জড়াতে হবে।কারন দেশ, সমাজ, ধর্ম কিংবা পরিবারের বিপক্ষে যায় এমন কোন সংগঠন ভাল কিছু বয়ে আনবেনা তা নিশ্চিত।

আমি মনে করি একটি সংগঠন ছাত্র-ছাত্রীকে অনেক বেশি  সহনশীলতা শেখায়, একসঙ্গে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুনির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধের ভিত্তিতে তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে যা থেকে একজন সদস্য সহজে সঠিক মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়ে থাকে।

আমরা যদি বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস লক্ষ করি দেখবো যে সংগঠনের একটি বিরাট ভূমিকা রয়েছে মানবসমাজ গঠনে।কারন ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশক অবধি আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল একরকম অনেকটা লেখাপড়ার আর খেলাধুলার সংস্কৃতি।পাড়ায় পাড়ায় ছিল গ্রন্থাগার , সাংস্কৃতিক দল বা সংঘ। তখন সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতিযোগিতা ছিল একটি সাধারন দৃশ্য। পাড়া বা মহল্লায় একটি  সাংস্কৃতিক পরিবেশ দৃশ্যমান ছিল।তখনকার সমাজ কাঠামো যতটা দৃঢ় ছিল এখন সেটি লক্ষ্য করা যায়না। এর কারন গুলো খুঁজে দেখলে সহজে অনুমান করা যায় যে, স্বাধীনতা-উত্তরকালে নানা পরিবর্তনের সাথে সাথে  আমাদের মূল্যবোধগুলোও প্রচণ্ডভাবে নড়বড়ে হয়ে পরেছে। তার প্রভাব আমরা বর্তমান সমাজে প্রতিটি ক্ষেত্রেই লক্ষ করছি।বর্তমান সমাজে মানুষের মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা, অপসংস্কৃতির চর্চা , দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংকট এগুলো দূর হতে পারে কেবল সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের মাধ্যমে, সৃজনশীল সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত করার মাধ্যমে। ভালো যে কোনো সংগঠন তা হোক সাংস্কৃতিক, হোক ক্রীড়াকেন্দ্রিক , হোক ভাষাভিত্তিক , হোক পরিবেশ রক্ষার যা-ই হোক না কেন, অবশ্যই সেই সংগঠনের নির্দিষ্ট কিছু মূল্যবোধ বা আদর্শ থাকে। সেই সংগঠনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ব্যক্তি যেমন নিজেকে বিকশিত করতে পারে, তেমনি সামাজিক সুস্থতাও আসতে পারে এই উপায়ে।কারন পড়াশোনা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম একে অপরের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।

আমি মনে করি সংগঠনগুলোর মধ্যে যদি জবাবদিহির জায়গা তৈরি করা যায় তবে সামনের দিনে সংগঠনের অগ্রগতি আরও বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।সংগঠনের ছায়ায় ব্যক্তি নিজেকে বিকশিত করতে পারার আরো অনেক সুযোগ তৈরি হবে।পরিশেষে বলব সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার জন্য সংগঠন করা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।

লেখকঃ ফারজানা ভূঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।