করিমগঞ্জে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সফল জননী রত্নগর্ভা বেগম হামিদা খাতুন

1 month ago
4:04 pm
21
অন্যান্য নারী ও শিশু করিমগঞ্জে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সফল জননী রত্নগর্ভা বেগম হামিদা খাতুন

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে শ্রেষ্ঠ জয়িতা সফল জননী জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন বেগম হামিদা খাতুন। তিনি উপজেলার কলাবাগ গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬১ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৃত আব্দুল আজিজ একজন ব্যবসায়ী এবং মাতা মৃত ফরমুজা খাতুন একজন গৃহিনী ছিলেন। পরিবারের আর্থিক দূর্দশা না থাকলেও পড়াশোনার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ ছিল না।

স্কুল থেকে বাড়ির দূরত্ব ছিল ৪/৫ কিলোমিটার। রাস্তা ছিল খুবই খারাপ, ছিল না কোন যানবাহন। পরিবারে পড়াশোনার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ না থাকলেও বেগম হামিদা খাতুনের অদম্য ইচ্ছায় ১৯৭৭ সনে বালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় করিমগঞ্জ হতে এস.এস.সি. পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বাড়ি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে অবস্থিত গুরুদয়াল সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন তিনি। নিকটাত্মীয় না থাকায় দূরসম্পর্কের এক বোনের বাসায় থেকে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ঐ বোনের বড় মেয়ে এক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়। পারিবারিক কারণে পরবর্তীতে শহরের বাসা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। শহরে তার থাকার আর কোন জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়।

১৯৮০ সনে দেলোয়ার হোসেনের সাথে হামিদা খাতুনের বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহে ১৯৮২ সনে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ এবং ১৯৮৫ সনে চাকুরিতে যোগদান করেন। তার স্বামী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন।

হামিদা খাতুনের ঘর আলো করে জন্ম গ্রহণ নেন নুসরাত হোসাইন জনি, মোঃ জুলফিকার হোসাইন রনি এবং ডাঃ বেনজীর হোসাইন সনি। আর্থিক চাপে থাকলেও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে খুবই তিনি খুবই আগ্রহী ছিলেন। সন্তানদের পড়াশোনার পরিবেশ যেন কোনভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয় সে ব্যাপারে তিনি ছিলেন অটল। তিনি বিশ্বাস করতেন পড়াশোনার মাধ্যমেই একজন মানুষ নিজের অবস্থানকে পরিবর্তন করতে পারে। নিজের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অন্তরায় ছিল তা তার সন্তানদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে রাখবে না মর্মে পণ করেন। শুরু হয় নতুন এক যুদ্ধ। সন্তানদের ভবিষ্যত মঙ্গলের কথা চিন্তা করে ১৯৯৬ সনে গ্রামের বাড়ী হতে কিশোরগঞ্জ শহরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন এবং সন্তানদেরকে শহরের স্কুলে ভর্তি করেন। শত আর্থিক দৈন্যতা সত্ত্বেও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেননি তিনি। নিজের মনের সকল স্বাদ-আহ্লাদ, ইচ্ছা, চাহিদাকে বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের সৃজনশীল কাজগুলোকে সবসময় উৎসাহ প্রদান করে গেছেন।

তার প্রথম সন্তান নুসরাত হোসাইন জনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে নৃ-বিজ্ঞানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে সে স্বামীর সাথে সুইডেনে অবস্থান করছে। দ্বিতীয় সন্তান মোঃ জুলফিকার হোসাইন রনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিভাগে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করে। বর্তমানে সে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে সিনিয়র সহকারী জজ হিসেবে শেরপুরে কর্মরত আছেন। তার পুত্রবধু ফারিন ফারজানা সেও বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে শেরপুরে কর্মরত আছেন। তৃতীয় সন্তান ডাঃ বেনজীর হোসাইন সনি জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হতে এমবিবিএস ডিগ্রী অর্জন করে বর্তমানে বেসরকারী আব্দুল হামিদ মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে কর্মরত।

বেগম হামিদা খাতুন বলেন, আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষিত ব্যক্তি রাষ্ট্রের কি সমাজের কি পরিবার কি তার নিজের জন্য সম্পদ। আমার ব্যক্তি জীবনে পড়াশোনা শেষ করতে না পারার যে অপূর্ণতা ছিল, আমি আমার সামথর্যরে সর্বোচ্চটুকু দিয়ে সন্তানদেরকে নিজ পরিচয়ে পরিচিত করার চেষ্টা করেছি। সন্তানদেরকে নিজ পরিচয়ে পরিচিত করতে যেয়ে আজও আমি ভাড়াটিয়া। এতে আমার নূন্যতম দুঃখবোধ নেই। আমি দেশের প্রতিটি মাকে বলতে চাই একটি উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। একজন মা-ই পারেন সন্তানদেরকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে।