ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন প্রজন্ম কোন পথে?

4 months ago
3:37 pm
149
অন্যান্য কলাম ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় নতুন প্রজন্ম কোন পথে?

বর্তমান নতুন প্রজন্ম আগামী দিনের তরুণ সমাজ আর সেই তরুণ সমাজ, তারুণ্য একটি অসীম প্রাণশক্তি, যা অফুরন্ত সম্ভাবনা ও বর্ণিল স্বপ্ন দ্বারা পরিপূর্ণ। আর সেই নতুন প্রজন্মের ভাবনাগুলোই হবে এক সময়ের তরুণদের ভাবনা, যে ভাবনাগুলো হবে সোনার বাংলাদেশ গঠনের ভাবনা, বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার ভাবনা, আর সেই তরুণ সমাজের আপাদমস্তক চিন্তা-ভাবনা হবে বাংলাদেশকে নিয়ে। যার সকল অস্তিত্ব থাকবে বাংলাদেশ কে ঘিরে। এমন তরুণ সমাজ গড়ে তোলতে হলে বর্তমান নতুন প্রজন্মকে তৈরি হতে হবে পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনা হবে সুন্দর সমাজ গঠনের, সেই পরিকল্পনা হবে সুন্দর জীবন গঠনের, সেই পরিকল্পনা হবে দেশ, জাতি এবং দেশের মানুষের ইতিহাস জানার।

সঙ্গত কারনেই একটি প্রশ্ন চলে আসে তাহলে সেই নতুন প্রজন্মকে জানাবে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস। যদিও আমরা সবাই জানি মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির কাছে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা এবং যত দিন বাঙালি জাতি থাকবে, যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন এই মুক্তিযুদ্ধই থাকবে শ্রেষ্ঠ গৌরবের অধ্যায় হিসেবে, অবিস্মরণীয় এক গৌরবগাঁথা হিসেবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে এই বাংলাদেশের মানুষ এই দেশ, দেশের মানুষ, দেশের মানুষের ভাষা এবং অধিকার রক্ষায় আরো অনেকবার বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছে।কারণ বাঙালি জাতি জন্ম থেকেই কোনো না কোনো শাসক দ্বারা শোষিত হয়েছে, অনেক কিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে এই জাতিকে টিকে থাকার জন্য। কখনো মোগল-পাঠান, কখনো ব্রিটিশ, কখনো পাকিস্তানিদের দ্বারা জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে বাঙালি অসহায় জাতিকে।বাঙালির ইতিহাস মানেই শোষণ আর অধিকার থেকে বঞ্চনার ইতিহাস। বাঙালির ইতিহাস মানে না পাওয়া আর বেদনার ইতিহাস। কিন্তু এই শোষণ, বঞ্চনা আর না পাওয়ার লড়ায়ে যে শুধু বাঙালি জাতি অত্যাচার সহ্য করেছে তা নয়। নিজেদের অধিকার রক্ষায় বাঙালি জাতি গর্জে উঠেছে বারংবার। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে যেমন মায়ের মুখের ভাষাকে ছিনিয়ে এনেছে ঠিক তেমনি সমগ্র জাতি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্র হাতে তুলে নিয়েছিল নির্ভয়ে। তাই আজকের নতুন প্রজন্মকে সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য দরকার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তাদের সামনে উপস্থাপন করা।

আমাদের মনে রাখতে হবে নিজেদের দেশ সম্পর্কে জানার আগ্রহ নিজেদেরকেই তৈরি করতে হবে। কারন ইতিহাস দেখলে দেখবো যে বিদেশিরা কখনো দেশ কে বাঁচাতে আসে না, আসে কেবল শোষণ করতে, ধ্বংস করতে। ৩০ লাখ শহীদের বুকের তাজা রক্ত, লাখ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং সীমাহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে একাত্তরের ৯ মাস যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় এসেছিল বাংলার বুকে। যদি সেই বাংলাকে বিশ্বের বুকে তুলে ধরতে হয় তবে সে দায়িত্ব দেশের মানুষকেই কাঁধে তুলে নিতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্র তার একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, “বাঙালি নিজেকে না বাঁচালে কেউ তাকে বাঁচাবে না।”

এই উত্তরে সহজেই অনুমান করা যায় নিজের দেশ কে নিজেই রক্ষা করতে হবে। অন্য কেউ তা করে দিবে না। দেশের পাঠ্যপুস্তকে দেশের সূর্য সন্তানদের জীবন এবং আত্মত্যাগের ইতিহাস তরুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।আজকের নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা দরকার যে মুক্তিযুদ্ধের আগেও এই জাতি অনেকবার অনেক ভাবে জীবন দিয়েছে এবং বাঙালি জাতিকে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে এই পতাকা ছিনিয়ে আনতে। মুক্তিযোদ্ধারা যে জীবনকে তুচ্ছ করে, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেশমাতা ও মাতৃভূমিকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয়ের পতাকা ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিলেন, তা নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে। নতুন প্রজন্মকে এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে। কারা সেই চেতনা ধারণ করছে তা জানতে হবে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অর্জনকে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি জাতিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার—সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল পাকিস্তানিরা এবং হানাদার বাহিনী। ফলে তারা শ্রমজীবী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ এ দেশের সূর্যসন্তানদের হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতি কিভাবে তাদের পরাজিত করেছিল, তার যথাযথ ইতিহাস নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবারই।

আজকের তরুন প্রজন্মকে যদি প্রশ্ন করা হয় কি দিয়ে তারা দাবী করবে যে , এই দেশ তাদের এবং এই দেশের মানুষ তারা? তাদের চেহারা, তাদের পোশাক নাকি তাদের শিক্ষা? অবশ্যই তাদের ভাষা এবং ঐতিহ্য দিয়ে। নিজের দেশ,দেশের ইতিহাস এবং দেশের মানুষ সম্পর্কে না জানলে অচিরেই নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে পরতে হবে নতুন প্রজন্মকে।

তাহলে সেই ভাষা এবং ঐতিহ্য রক্ষায় কাদের ভূমিকা বেশি?? কারাই বা পৌঁছে দিবে দেশ সৃষ্টির সত্যিকারের ইতিহাস, কারা পৌঁছে দিবে প্রকৃত সত্য ঘটনাগুলো? এই একটি প্রশ্নের উত্তর যদি সহজ ব্যাখ্যা দিতে পারি তবে কাজটি সহজ হয়ে যাবে। আমরা যদি একটি দেশ কে মানব দেহ কল্পনা তরি তবে সেই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা হলো শরীর আর মন হলো শিক্ষা ব্যবস্থা। একটি শরীর তখনই ভাল থাকে যখন মন ভাল থাকে। তাই মন কে ভাল রাখার জন্য প্রয়োজন মনের যত্ন নেওয়া। মনের যত্ন নিতে হলে তার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া জরুরী।

আমরা যদি বাংলাদেশের কথা চিন্তা করি বাংলাদের জাতীয় আয়ের (জিডিপি) এর মাত্র ১% স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আর ২-২.৫০% শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে।

শিক্ষাকে যদি জাতি গঠনের প্রধান বিনিয়োগক্ষেত্র মনে করা হয় তাহলে আমাদের এই ব্যয় বাড়াতে হবে। শুধু ব্যয় বাড়ালেই হবে না পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা কে সার্বজনীন করতে হবে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে একই কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী বলে মনে করে দেশের চিন্তাশীলগন। আর শিক্ষাকে সার্বজনীন করার প্রথম শর্ত হলো শিক্ষার ক্ষেত্রে জাতীয় ভাষা কেই প্রধান ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় আবশ্যকভাবে দেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য কে অন্তর্ভূক্ত করা। পাশাপাশি শিক্ষার গুনগত মান বৃদ্ধি করতে হবে। আর তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষার পরিমানগত মান বৃদ্ধি করা। এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের কোন বিকৃত না হয়।

শুধু তাই নয় শহীদদের মহান আত্মত্যাগের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করণ এবং জাতীয় ভাবে তা সংরক্ষণ , রক্ষণাবেক্ষন এবং সকলের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের পবিত্র দায়িত্ব। আর তা যদি করতে না পারি তবে অচিরেই শহীদদের এই মহান আত্মত্যাগের সাহসী গল্পগুলো হারিয়ে যাবে সন্ধ্যার বাতাসে। তাই জাতির সূর্য সন্তান দের জন্য যে মহান দিবস উদযাপন করা হয় সেই দিবসগুলো যেন কেবল সভা, সেমিনার, বক্তৃতা কিংবা দোয়া মাহফিলের মধ্যেই শেষ হয়ে না যায়।জাতির সূর্য সন্তানদের প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হলে জানতে হবে তাদের ইতিহাস। যা শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সার্বজনিন শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।

আজকের নতুন প্রজন্মই নেতৃত্ব করবে আগামী দিনের রাষ্ট্রকে। তাই সেই প্রজন্ম ভালবাসার মশাল জ্বালিয়ে নাকি স্বার্থপরতার ছুঁড়ি শানিয়ে বড় হচ্ছে তা জানা অত্যন্ত জরুরি। সমাজবিজ্ঞানী টলস্টয় বলেছেন,”কোন রাষ্ট্রের জেলখানা যে দেখেনি সেই রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে সে অজ্ঞ”।টলস্টয়ের পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কারন এই কথাটি শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কেও ঠিক একই রকম। একটি রাষ্ট্রকে চেনা যায় তার শিক্ষা ব্যবস্থা দেখে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় এই বাংলাদেশ সৃষ্টির সঠিক ইতিহাস এবং মহান শহীদদের জীবন গল্পগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া যেমন জরুরী তেমনি দেশকে বিশ্বের মানচিত্রে পরিচিত করতে হলেও তা আবশ্যক।

 

লেখকঃ ফারজানা ইসলাম ভূঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী
নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।