নাটোরে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা মিমাংসার সত্যতা মিলেছে

1 month ago
3:30 pm
26
অন্যান্য নারী ও শিশু নাটোরে ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনা মিমাংসার সত্যতা মিলেছে

নাটোরে দেড় লাখ টাকায় কলেজ ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার সত্যতা পেয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। রোববার তদন্ত রিপোর্ট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ঢাকা ও রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা। কঠোর অবস্থান নেবার কথা জানিয়েজেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট জুনাইদ আহমেদ পলকও।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর দ্বাদশ শ্রেণীর এক কলেজ ছাত্রী তার ছোট বোনকে ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি করাতে নাটোরের হাতিয়ান্দহ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে যান। ভর্তির কাগজপত্র জমা দেবার পর কৌশলে ছাত্রীটি পাশের রুমে নিয়ে গিয়ে তাকে জাপটে ধরে যৌন নিপীড়ন করে অফিস সহকারী রেজাউল করিম। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মেয়েটি নিজেকে ছাড়িয়ে ছোটবোনকে নিয়ে বাড়িতে এসে ঘটনাটি পরিবারকে জানায়। পরে মেয়েটির পরিবারের লোকজন শিক্ষা ঐ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেনকে ঘটনাটি জানায়। তখন থেকেই অধ্যক্ষ, বিদ্যালয়ের সভাপতিসহ অন্যান্যরা ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে তৎপর হয়ে উঠেন। তারই অংশ হিসাবে ২৯ ডিসেম্বর কলেজের এক রুমে অভিযুক্ত রেজাউলকে চর থাপ্পর আর পা ধরে মাফ চাওয়ানো হয়। জরিমানা করা হয় দেড় লাখ টাকা। পরে ভুক্তভোগীদের দেড় লাখ টাকা দিয়ে ঘটনাটি আপস মিমাংসা করেন কলেজ অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন এবং সহকারী অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা, সিংড়া থানা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও বিদ্যালয়ের সভাপতি নওফেল চৌধুরী ভিটু, শেরকোল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম। এসময় বিদ্যালয়ের শিক্ষক হাসান আলী ও ডাঃ সামাদ উপস্থিত ছিলেন।

হাতিয়ান্দহ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান চঞ্চল জানান, গত ১৯ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের সভাপতি নওফেল চৌধুরী ভিটুর ফোন পেয়ে তিনি বিদ্যালয়ে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন ছাত্রীকে যৌন হয়রানির বিষয়ে আপস মিমাংসা করার উদ্যোগ নিয়েছে তারা। সব শুনে তিনি বলেন, এটা আপসযোগ্য অপরাধ না। এমন ন্যাক্কারজনক অপরাধের জন্য বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী রেজাউলকে বহিঃস্কারের দাবীও জানান। এতে শিক্ষক হাসান আলী ও ডাঃ সামাদ একমত পোষন করলেও অধ্যক্ষ ইসমাইল হোসেন, অধ্যাপক প্রবীর কুমার সাহা, সভাপতি নওফেল চৌধুরী ভিটু, শেরকোল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাতে আপত্তি জানিয়ে আপস মিমাংসার দিকেই ধাবিত হয়। পরে শিক্ষক হাসান আলী ও ডাঃ সামাদসহ তিনি সেখান থেকে চলে আসেন বলে জানান।
অত্যন্ত গোপনে ঘটনাটি ধামাচাপা দিলেও ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে যৌন নিপীড়নের মতো স্পর্শকাতর ঘটনাটি তারা মিমাংসা করেছে দেড় লাখ টাকায়।

প্রভাবশালীদের চাপের মুখে মিমাংসা ও টাকা নিতে বাধ্য হয়েছেন। পরে ঘটনাটি পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা অবগত হলে তার নির্দেশে ৭ জানুয়ারি অভিযুক্ত রেজাউলকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। এর আগে ভুক্তভোগী ছাত্রী অভিযুক্ত রেজাউলকে একমাত্র আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলায় আপস মিমাংসার কথা উল্লেখ না থাকায় মিমাংসাকারীরা আইনের আওতার বাইরেই থেকে যান।

পরে জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয় থেকে গঠন করা হয় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায় তদন্ত কমিটি। রোববার তদন্ত রিপোর্ট মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ঢাকা ও রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন ও সেই সাথে আপস মিমাংসাকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন নাটোর ০৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী এ্যাডভোকেট জুনাইদ আহমেদ পলক। গত ১৪ জানুয়ারি সিংড়া উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির জানুয়ারি মাসের মাসিক ভাচুর্য়াল সভায় নিপীড়ন ও মিমাংসাকারীদের কঠোর শাস্তির হুসিয়ারী দেন তিনি। বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী নির্যাতন দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তারপরও যৌন হয়রানী এবং আপস মিমাংসার মতো ঘটনা শুনে অবাক হতে হয়। এই নিন্দিত কাজের সাথে যারা যারা জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। এজন্য আইনশৃঙ্খলাবাহিনীসহ সবাইকে কঠোর হবার আহবান জানান তিনি।

তদন্ত কমিটির প্রধান জেলা শিক্ষা অফিসার রমজান আলী আকন্দ বলেন, কলেজের অফিস সহকারী যৌন নিপীড়ন করে যতোটুকু অপরাধী। যারা ঘটনাটি আপস মিমাংসা করেছিল। তারাও সমান অপরাধী। তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। উর্দ্ধতন কতর্ৃপক্ষের কাছে অধ্যক্ষকে বহিঃস্কারের সুপারিশসহ বর্তমান কমিটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হবে।
শিক্ষক নেতারাও দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবী জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতি, নাটোর জেলা শাখার সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক জানান, পুরো ঘটনাটি অন্যন্ত ন্যাক্কারজনক। দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দিয়ে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে যৌন নিপীড়নের মতো ভয়াবহ অপরাধ এবং তা ধামাচাপা দেবার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।