‘আত্মহত্যা নয়, নিজেকে জয় করার গর্বে গর্বিত হোক প্রতিটি জীবন’

2 months ago
6:21 pm
215
অন্যান্য কলাম ‘আত্মহত্যা নয়, নিজেকে জয় করার গর্বে গর্বিত হোক প্রতিটি জীবন’

একটি সম্পূর্ণ নতুন মেশিন বহুদিন ব্যবহার করলে কিংবা যত্রতত্র ব্যবহার করলে সেই যন্ত্রও একপর্যায়ে বিকল হয়ে পড়ে। কলকব্জায় মরিচা ধরে। কারন যন্ত্রপাতিরও যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আর মানুষ তো একটি জলজ্যান্ত মানব যন্ত্র। মানবদেহের প্রতিটি অংশের আলাদা করে যত্ন নিতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যত্যয় দেখা যায়। যার ফলশ্রুতিতে বাস্তবতার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছে অনেক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা মনের অসুখকে কেবল পাগলামি বলে তুচ্ছ মনে করি। এই গুরুত্বহীনতার কারণে বলি হতে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণকে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র প্রত্যয় হেরে গিয়ে চলে গেল পৃথিবীর সকল সত্যকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। শুধু প্রত্যয় নয়, গত বারো বছরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও বারোজন শিক্ষার্থী জীবনের কাছে হার মেনে চলে গেছে না ফেরার দেশে। প্রত্যয়ের আশেপাশের বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজন এবং অন্যরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক থেকে ধারনা করে এবং তাকে দীর্ঘদিন দেখে বলছে,’ প্রত্যয় এমন করতে পারে না/ প্রত্যয় অনেক ধার্মিক ছিল ওর পক্ষে এমন কাজ করা সম্ভব নয় ইত্যাদি। আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি এই জায়গাটিতেই কারন আমরা কেন মনে করি একজন মানুষ হাসিখুশি, ধার্মিক কিংবা জীবনে সফল মানেই তার কোন ধরনের মনের অসুখ হতে পারে না। তাদের কোন ধরনের ডিপ্রেশন থাকতে পারেনা এমন কেন মনে করতে হবে? তাহলে ডিপ্রেশন আসলে কাদের হয় ,কোন বয়সের হয়, কেন হয়? ডিপ্রেশন কি তবে নির্দিষ্ট কোন বয়সের কিংবা শ্রেণীর মনের রোগ?

জীবনধারণের জন্যে মানুষ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। রোজকার এতো দৌড়ঝাঁপ, এতো সংগ্রাম, এতো ছলচাতুরী, এতো অপরাধ, এতো নিয়মের ভাঙা-গড়া, সবকিছুর পেছনে মানুষের একটাই কারণ কাজ করে- বেঁচে থাকা। কিন্তু এই মানুষই আবার সময় সময় নিজের উপরে হিংস্র হয়ে ওঠে, নিজেকে শেষ করে দিতে এক বিন্দু দ্বিধা করে না। জীবনের কোনো না কোনো এক সময় প্রত্যেকের মনেই আত্মহত্যার চিন্তা ভর করে। কিন্তু কেন? কেন এতো ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় মানুষ?

আমি যেহেতু মনোবিজ্ঞানের ছাত্র না তাই আত্মহত্যার প্রবণতার বিজ্ঞান ভিত্তিক আলোচনা আমার কাজ নয়। আমি কেবল আত্মহত্যার সবচেয়ে বড় কারন ডিপ্রেশনের পেছনে সামাজিক কারণগুলো নিয়েই কথা বলতে পারি।আত্মহত্যার প্রবণতা যদিও একটি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যা কিন্তু এর সঠিক কার্যকারণ খোঁজতে হলে এবং এর সমাধান বের করতে চাইলে আমাদের মনোজগতের পাশাপাশি সামাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণকেও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানে আত্মহত্যা বিষয়ক যত গবেষণা হয়েছে তার মধ্যে এমিল ডুরখেইমের বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Suicide’ অন্যতম। তিনি তাঁর বইয়ে দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদ আমাদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এবং সাচ্ছন্দ্য দিলেও প্রায়শই সেটি আমাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে রাখে। এই নতুন বাস্তবতা সেই সময় মানুষের মনে অস্থিরতা তৈরি করছিল। সেই সময় ফ্রান্সে পুঁজিবাদের শক্ত শিকড় গড়ে ওঠার পাশাপাশি আত্মহত্যার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল।বর্তমানে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আত্মহত্যার ঘটনাবলীতেও আমরা ঠিক তেমনই প্রবণতা দেখতে পাই।এর কারন হলো ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার নানা দিক আমাদের মনে ও জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। যেখানে জীবন এখন অনেক বেশি ব্যক্তি কেন্দ্রিক এবং অন্যকে দেখানোর প্রবণতা খুবই জোরালো ভাবে উপস্থিত। যে চিত্রটি পূর্বে আমাদের সমাজে অতটা প্রকট ছিল না।

পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও একটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বর্তমান সময়ে মানুষের মনে। যেমন মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যা করছে বা কখনো করেনা কিন্তু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সবকিছুকে একটু বেশি অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করে আনন্দ পাচ্ছে। যে বা যারা সেই সব কাজ করতে পারছেনা তারা সেইসব দেখে নিজের অজান্তেই মানসিক চাপ নিয়ে বসে থাকে। যা তাদের একসময় হতাশার দিকে ধাবিত করে। পশ্চিমা লেখক ম্যানসনের একটি বইয়ে এই প্রসঙ্গটি খুব সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করেছেন তার লেখনীতে। আধুনিক জীবন প্রণালীর নানাবিধ হাতছানি এড়িয়ে তাই সহজ জীবন-যাপন করা কঠিন হয়ে পরছে বর্তমান সময়ের জন্য। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভিডিও গেইম নানা রকম পর্ণগ্রাফীতে আসক্তিসহ ভয়াবহ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়াও বর্তমানে আত্মহত্যার বড় কারন বলে মনে করা হচ্ছে। সামাজিক অবক্ষয় এই সব কাজকর্ম করতে আরও বেশি উৎসাহিত করে।

এছাড়া বয়ঃসন্ধিকালীন সময়ে পরিবারের সকলের সাথে দূরত্ব এবং লেখাপড়ার চাপে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সকল পর্যায়ে অর্থাৎ মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এই প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলছে। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির সাথে যে অমিল থাকে তা সহজে ছাত্র- ছাত্রীরা মেনে নিতে পারে না বলেই তাদের মধ্যে হতাশার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। আর এই বয়সের তরুণ-তরুণীরা যতই হতাশায় থাকুক না কেন তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ পরিবারের অন্যদের সাথে এই বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী হয় না। আর সবচেয়ে বড় যে সমস্যা তা হল সহজে সকলের সাথে সব কথা বলার মতো সামাজিক ও পারিবারিক চর্চা এখনো বাংলাদেশের সব পরিবারে গড়ে উঠেনি। একটি পরিবার যখন সন্তানের জন্য আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত না হয়ে চাপ সৃষ্টির কারখানা হয়ে উঠে তখন সন্তান আরও বেশি হতাশাময় একটি পরিস্থিতির মধ্যে তলিয়ে যায়। আমরা জানি কোন বাবা-মাই সন্তানের খারাপ চায় না কিন্তু সঠিক পরিচর্যার কৌশল জানা না থাকার ফলে অনেক বাবা-মাই অবচেতনে সন্তানের ওপর তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে জোড় করে চাপিয়ে দেন। আর এভাবেই সন্তানের সাথে পরিবারের দ্বন্দ্ব এবং অলঙ্গনীয় দূরত্ব তৈরি হয়ে যায় যা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পারিবারিক বিছিন্নতা ও মানসিক এই চাপ ছেলে-মেয়েকে এমন বিপর্যস্থ করে ফেলে যে সেখান থেকে পরিত্রানের একমাত্র উপায় হিসেবে আত্মহত্যাকেই শ্রেয় মনে করতে শুরু করে।

বর্তমান সময়ে ক্রমবর্ধমান ব্যস্ততা বাবা-মাকে জীবনে ক্রমেই তাদেরকে সন্তান থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। যেন প্রতিটি মানুষ তার চারিদিকে এক অদৃশ্য দেয়াল নিয়ে ঘুরছে। যে পরিমাণে নিত্য নতুন মানসিক সমস্যায় মানুষ রোজ আপতিত হচ্ছে, সে পরিমাণে মানসিক সহায়তা তারা একে অপরের কাছ থেকে পাচ্ছে না। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানসিক রোগের হার, বৃদ্ধি পাচ্ছে আত্মহত্যার হার। অথচ একটু সচেতনতাই পারে অসংখ্য জীবন বাঁচাতে। বেশিরভাগ আত্মহত্যা সংঘটিত হয় অন্তত একজন পাশে থাকার মানুষের অভাবে। বেশিরভাগ আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি থাকে না যে তাদের চিন্তা ভাবনা আসলে সীমাবদ্ধ এবং তাদের সাহায্যের প্রয়োজন। একজন বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা পরিচিত যে কেউ বিষণ্ণতার মধ্যে দিয়া যাবার সময় আমাদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। তার সাথে জীবনের আশামূলক দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত; কিংবা প্রয়োজনে কিছুই না বলে শুধু তার কথা শোনা উচিত। শুধু কয়েকটা নিশ্চুপ মুহূর্তও একজন মানুষের জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। সেজন্য নিজের উপরে বিশ্বাস রাখা খুব জরুরী।জীবনকে যতগুলো সম্ভব সুযোগ দেয়া উচিৎ। রাতের সবচেয়ে অন্ধকার সময়টার পরেই ভোরের সূর্যোদয়ের দেখা পাওয়া যায়। আজ সময় যত কঠিন, কাল ততটা না-ও থাকতে পারে। আজ যেখানে শুধুই গুমোট মেঘ, কাল সেখানে রংধনুর ছড়াছড়ি হতেই পারে। এটাই জীবনের নিয়ম। এই নিয়মের সাথে তাল মিলিয়েই এগিয়ে যাক প্রতিটি মানুষ। সুন্দর হোক সবার জীবন। কেবল নিজেকে জয় করার গর্বে গর্বিত হোক প্রতিটি জীবন। গানের ভাষায় বলতে চাই, “কতো লক্ষ জনম ভ্রমণ করে পেয়েছি এই মানব জনম, এ জীবন চলে গেলে, ও ভোলা মন, আর তো পাবো না…।”

লেখক: ফারজানা ভূঁইয়া
সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।