গৌরনদীতে মৃৎশিল্পের দুর্দিন, কুমারপাড়ায় নীরবতা

2 weeks ago
9:41 pm
20
অন্যান্য বিশেষ প্রতিবেদন গৌরনদীতে মৃৎশিল্পের দুর্দিন, কুমারপাড়ায় নীরবতা

বাঙালি জীবনের হাজার বছরের ঐতিহ্য বহনকারী মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা কমতে থাকায় উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

আধুনিক জিনিসপত্রের ভিড় আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকা ও মাটির দাম বৃদ্ধিসহ নানা সংকটে এ শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে বলে দাবি কুমারদের।

মৃৎশিল্প বাঙালির শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য। কিন্তু কালের বিবর্তনে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এই শিল্পের প্রসার। অনেকে এ পেশায় থাকলেও মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা না থাকায় অভাব-অনটনে সংসার চালাতে হচ্ছে তাদের। এক-আধবেলা খেয়ে কোনো রকম দিন পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। এক সময়ের কর্মব্যস্ত কুমারপাড়ায় এখন শুনসান নিরবতা।

গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দর এলাকার পাল পারার অসংখ্য পরিবার এ পেশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও কিছু দিনের ব্যবধানে প্রায় ৫০টি পরিবারেরও বেশি পরিবার এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

জানা গেছে, বরিশাল জেলার মাটি বেলে দোআঁশ হওয়ায় আগৈলঝাড়া ও উজিরপুর থেকে মাটি সংগ্রহ করে এসব সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন মৃৎশিল্পীরা।

মৃৎশিল্পী বিকাশ পাল। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ পেশায় নিয়জিত আছেস। তিনি বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় আমরা মাটির জিনিস তৈরি করে আসছি। এ পেশার সঙ্গে আমরা জড়িত থাকলেও আমাদের উন্নয়নে বা আর্থিক সহায়তায় সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। সরকারি ও বিভিন্ন এনজিও বা সমিতি থেকে সহযোগিতা পেলে হয়তো বাপ-দাদার আমলের স্মৃতিকে ধরে রাখা সম্ভব হতো।

মৃৎশিল্পী রগু পাল বলেন, ‘এ শিল্পের জন্য আড়াই শতক (১ কাঠা) মাটি কিনতে লাগে ৫০ হাজার টাকা। তারপর আবার মাটি অনেকেই দিতে চায় না।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, নানামুখী সংকটের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প। ফলে মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত পরিবার গুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। স্টিল, চিনামাটি, মেলামাইন ও প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বাজারে আসার পর মানুষ আর মাটির তৈরি হাঁড়ি, থালা, গ্লাস, মসলা বাটার পাত্র, মাটির ব্যাংক ও খেলনা সামগ্রী ইত্যাদি ব্যবহার করছেন না। এখন শুধু গবাদিপশুর খাবারের জন্য গামলা, কলস, মাটির ব্যাংক, মাটির পাতিল ও সংখ্যালঘুদের পূজা-পার্বণের জন্য নির্মিত কিছু সামগ্রীর চাহিদা রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের অনেক মানুষ অবশ্য এখনও দৈনন্দিন প্রয়োজনে কিছু মাটির তৈরি পাত্র ব্যবহার করেন। কিন্তু মাটির তৈরি সৌখিন জিনিসপত্রের বাজার চাহিদা তেমন একটা নেই বললেই চলে।

এক সময় কম দামে মাটি সংগ্রহ করা গেলেও এখন মাটি কিনতে হয় অনেক বেশি দামে। এছাড়া মাটি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে কুমার সম্প্রদায়ের সদস্যরা বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন।

অপরদিকে, গিতা বালা নামে এক নারী মৃৎশিল্পী জানান, প্রথমে মাটি তৈরি করে তার পর বিভিন্ন আসবাপত্র তৈরি করতে হয়। মাটির তৈরি এসব সামগ্রী শুকানো, রং করাসহ পুরোপুরিভাবে প্রস্তুত করতে সাত দিন সময় লাগে। পরে এসব সামগ্রী বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয় দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

মাহিলারা ইউপি চেয়ারম্যান সৈকত গুহ পিকলু জানান, ‘মাটির জিনিসের চাহিদা কমতে থাকায় দিন দিন মৃৎশিল্প ঐতিহ্য থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু সংখ্যক পরিবার এ শিল্পটি ধরে রেখেছে। সরকারি ভাবে যদি কোনো সহযোগিতা করা হয় তবে বাঙালির ঐতিহ্যময় এ শিল্প ধরে রাখতে পারবে মৃৎশিল্পীরা বলে জানান তিনি।