কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন, ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

1 month ago
4:26 pm
51
অন্যান্য পরিবেশ ও কৃষি কিশোরগঞ্জের হাওরে বোরো ধানের বাম্পার ফলন, ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

কিশোরগঞ্জের হাওরে এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় কৃষকেরা বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছে। তারপরও দালাল, ফরিয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ধানের প্রকৃত মূল্য পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছে প্রকৃত কৃষকরা। সরকার ২৮ এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তব অর্থে তা কাগজেই রয়েছে। এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমি বোরো চাষের আওতায় আসে। মৌসুমের শুরুতেই কালবৈশাখী ঝড়ে এবং গরম বাতাসে পরাগায়নে বাধাগ্রস্থ হয়। এতে হাওর বেষ্টিত উপজেলা সমূহে ২৫ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিনিয়র সচিবসহ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট ও কৃষি অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শন করে এই দুর্যোগের হাত থেকে ফসল রক্ষার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী কৃষকেরা পটাশ মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ জমিতে দেন। যার ফলে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান ছিটা থেকে রক্ষা পায়।

গত সপ্তাহে আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস ছিল উজানে অতিবৃষ্টি হতে পারে। দুর্যোগ-দুর্বিপাক ছাড়াই সময়মতো কষ্টের ফসল ঘরে তুলতে কৃষকরা আটঘাট বেধে মাঠে নামে। তাছাড়া এ বছর মৌসুমী কৃষি শ্রমিক লকডাউনের কারণে হাওরে আসতে না পারায় সরকার ১৩০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন কৃষকদের মাঝে বিতরণ করেন। উক্ত মেশিন দ্বারা মাত্র ২ জন লোক সারা দিনে ৮ একর জমির ধান কাটা, মাড়াই করতে পারে। যেখানে একজন কৃষকের ২৪০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন ছিল।

হাওরে ৫ মে পর্যন্ত নিম্ন এলাকায় ৯০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। উজান এলাকায় ৬৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। বৈশাখের তাপদাহে কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল বোরো ধানের দাম নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে বিআর-২৮ জাতের শুকনো ধান ৯শ থেকে সাড়ে ৯শ, বিআর-২৯ ৮শ থেকে সাড়ে ৮শ এবং হিরা জাতের ধান ৭৫০ থেকে ৮শ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া ভেজা ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৭শ থেকে সাড়ে ৯শ টাকায়।

চলতি বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় ১৩টি উপজেলায় ২৩ হাজার ৩৪৬ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ সাইফুল আলম জানান, চারটি উপজেলা অ্যাপসের মাধ্যমে এবং বাকী ৯টি উপজেলায় লটারীর মাধ্যমে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হবে। আগামী ১০ মে কৃষকের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। সে তালিকা অনুযায়ী ধান ক্রয় করা হবে। কিন্তু ২৮ এপ্রিল কিশোরগঞ্জে ধান ক্রয়ের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। এবার জেলার ১৩টি উপজেলায় ১০৮০ টাকা মণ দরে অর্থাৎ ২৭ টাকা কেজি দরে ২৩ হাজার ৩৪৬ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাওর থেকে নৌকায় করে চামটা নৌ-বন্দরে আসছে হাজার হাজার মেট্রিক টন ধান। নদীর পাড় থেকে ট্রাকে করে পরিবহন করা হচ্ছে সড়ক পথে। এমন দৃশ্য চোখে পড়বে হাওরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার চামটা নৌ-বন্দরে। বন্দরের ঘাটে প্রায় ৫০টি আড়তে চলছে নতুন ধান কেনা-বেচা।

আড়ৎ মালিক মো. খাইরুল ইসলাম জানান, এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় সহজেই কৃষক মাঠের ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর কাজ শেষে নিয়ে ফিরতে পেরেছেন। ধানের দাম আরও বাড়তে পারে। তাই কৃষকরা এবার ধান বিক্রি করছেন কম। মজুদের জন্য বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

অপরদিকে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রিতে কৃষকদের আগ্রহ কম থাকায় এবার ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা-এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে নির্ধারিত সময়ে ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল আলম জানান, চলতি বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ১১ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন। তবে ফলন ভালো হওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।