ছাত্র জীবনের অপরিপক্কতা : রিতা শেখ

7 months ago
3:58 pm
82
সাহিত্য ছাত্র জীবনের অপরিপক্কতা : রিতা শেখ

স্কুল জীবনটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই শৈশবের আধো আধো অস্পষ্টতার মাঝখানেই কেটে যায়।কিন্তু স্কুল জীবনটায় সবচেয়ে মূল্যবান সময় থাকে সবার জীবনে। এক মাত্র সেই সময়েই কেবল প্রকৃত বন্ধু আর বান্ধবী পাওয়া যায়। কিন্তু ওই সময় টাকে আমরা বুঝে উঠতে পারিনা, মাথায় বুদ্ধির অপরিপক্কতা, কাঁধে বইয়ের ভারী ব্যাগ, বাবা মায়ের শাসন -বাড়ন। স্কুল জীবনের দৈনন্দিন পড়াশোনার রুটিন, হোমওয়ার্ক, আরবি পড়ায় নিজেকে তৈরি করা আদব কায়দা শেখা একমাত্র সেই সময় টাই যেন এক প্রাথমিক স্কুল শুরু হয়।আর আধো আধো অস্পষ্টতার ব্রেইনে এত কিছু ধরে রাখা সম্ভব হয়না আমাদের। আমরা প্রকৃত বন্ধু পাই, আমরা খেলায় মেতে উঠি বিভিন্ন মায়া মনহোরী খেলায় আমরা নিজেকে পাই, সব মিলিয়ে মধুর সময় চলে যায়, এত কিছুর মধ্যে আমরা যেন বুঝতেই পেরে উঠিনা আমাদের জীবনে এই সময়টাতেই সব চেয়ে প্রকৃত বন্ধু পেয়েছিলাম। যার সাথে আমরা সব কিছুর পরিপূর্ণতা পেতাম।যাদের সাথে আমাদের হাজার মায়া জড়িয়ে পড়ে, ছোট্র ছোট্র দুষ্টামি, ছেলেমানুষী করে এসেছি।

মায়া বুঝে উঠতে না উঠতেই আমরা স্কুল জীবন পার করে কলেজ জীবনে পা দেই, বাবা-মা সন্তান কে মানুষরুপি শেইপ দেবার চিন্তায় কাটিয়ে দেয়,কিভাবে সন্তান কে পড়াশোনার রাস্তায় তুলে দেওয়া যায় বিপথে না যায় এই পথ থেকেই যেন তারা আগামীর পথ গুলি বেছে নেয়, আর আমরাও সেই মধুর শৈশবটাকে বিভিন্ন কিছু শিক্ষার চাপে পড়ে থাকি তখনো আমরা বুঝে উঠতে পারিনা প্রকৃত বন্ধু কি?

বা জীবনে প্রকৃত বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা আগামীতে আছে কিনা!! কলেজ জীবনে পা দিতে গিয়ে যখন স্কুল টা ত্যাগ করে চলে আসি ঠিক শেষের দিন টায় এসে আমরা অজানায় যে দশটা বছরে মায়া বেড়ে ওঠে সহপাঠীদের সাথে সেই মায়ায় স্থানটা ত্যাগ করতে একে অপরকে ছেড়ে আসতে আমরা সেদিন ভীষণ কাঁদি।তখনো আমাদের বুদ্ধিটা অপরিপক্কই থাকে।

কিন্তু জীবনের চরম সত্যি কথা হল আমরা ঠিক তখন কার মায়া না বুঝে কেঁদে এলোও সেই কান্না আর মায়ায় ছিল একদম খাঁটি মায়া। প্রিয় আর প্রকৃত বন্ধুকে ছেড়ে আসার অসাড়তম কষ্ট। যখন আমরা স্কুল জীবন ত্যাগ করে কলেজ জীবনে পা দেই।তখন সেই সময় টা চলতে থাকে আবেগের কঠিন সময়।স্কুল জীবনের সেই চিরচেনা মুখ গুলি ভাল ভাল শিক্ষা নিতে বিভিন্ন যায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে চলে যায়।

যৌবনের এক অমুক সময় চলতে থাকে তখন সবার জীবনে।শারীরিক গঠন,চেহারায় মধুরতা আর সরলতার চকচকে তারা জ্বলতে থাকে সবার চোখে মুখে আর জীবনে। তখন আমরা সেই স্কুল জীবনের চরম মুহূর্ত গুলা ভূলে যাই।একেতে চলতে থাকে দুই বছরের কলেজ জীবনের ইন্টারমিডিয়েট কোর্স সেই অল্প সময়ের কোর্স কে কম্পপ্লিট করার এক চিন্তা অন্য দিকে মনে থাকে হাজারো আবেগের স্বপ্নের আনাগোনা। চেহারায় চকচকে ভাব থাকার কারণে সেই সময়টাতে অনেক সুপুরুষ কেই আশে পাশে ভিনভিনাতে দেখা যাবে।আবেগের স্বপ্ন বুনবে দিন রাতে মনের জানালায়।ভর দুপুর ডুবিয়ে রাখবে মধুর আবেগীয় রাজ্যে তে।

এত কিছুর মধ্যে আমরা ভূলে যাই, জীবনে প্রকৃত বন্ধুর কথা।তখনো আমরা বুঝতে শিখিনা আমাদের জীবনে শুধু একজন কে দরকার যে জীবনের প্রথম থেকে শেষ অন্ধি নিশ্বাসের ভারী সিলিন্ডার কে বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন মানুষ দরকার পড়বে।একজন প্রকৃত বন্ধুর দরকার পড়বে। ঠিক যেই মুহুর্তে আমি পা পিছলে পড়ে যেতে ধরবো ঠিক সে মুহুর্তে পিছন থেকে হাত টা ধরে ফেলে নিবে। ইক্সামের (পরীক্ষার) দশ দিন আগে ব্যক্তিগত জীবনের ঝামেলায় বসে যখন কাঁদবে ঠিক সেই মুহুর্ত কে নষ্ট না করার অনুরোধ করবে।

আমরা তো সব কিছু ভুলে থাকি আবেগের জীবনের মোহনায়।সেই সময় অনেক সুপুরুষের দেওয়া স্বপ্ন কে আগে নিয়ে বাবা-মা যে আমাদের কে জাজ ব্যারিস্টার, শিক্ষক,শিক্ষিকা,ডক্টর প্রকৌশল বানানোর চিন্তায় ব্যস্ত থাকে দুই তিন টা টিউশন মাস্টার রেখে দেয় সন্তান কে সুশিক্ষা দিয়ে আগামীর পথ টা বেছে নেওয়ার সেই সময়টাতে আমরা বাবা মাকেও ধোকা দিয়ে সুপুরুষদের চিন্তায় দিন পার করে দিয়ে থাকি।কলেজ জীবনের সময়টাই নির্ধারণ করে কে কোথায় যাবে,কে কি হবে। কারণ এখান থেকেই কেউ ভারসিটি যাবে,কেউ ডক্টর হবে কেউ বা আবার বিভিন্ন বিভিন্ন যায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করার সুযোগ পাবে।এই সময় টা এমন একটা সময় দেখা যাবে অনেক ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট কে পিছিয়ে যেতে,হাত পায়ের শিরা কেটে হসপিটালের বেডে শীরা কেটে শুয়ে থাকবে,কেউ বা আবেগে পড়ে পায়ের রগ কেটে দিবে,কেউবা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে সময় টা নষ্ট করবে,কারো বা প্রমে সফলতা পাবে পেয়ে দিনরাত চুটিয়ে প্রেম করে সময়টা খেয়ে পস্তাবে,কারো কারো এই সময়টাতে বিয়ে হয়ে যাবে,কেউবা অর্থের অভাবে ঝড়ে যাবে, স্বপ্ন গুলি চুর চুর হয়ে যাবার দুংখ নিয়ে নিজেকে আর পরিবার কে বাঁচাতে জীবন যুদ্ধে মেতে উঠবে, কেউবা আবার টাকা না থাকলেও প্রতিকুল পরিবেশে নিজেকে ভাল প্রতিষ্ঠানে নেবার জন্য এক বেলা না খেয়ে সময় টা কাটিয়ে দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে পরিবারের সাথে যুদ্ধু করে আর এরই মধ্যে অনেকে আবার ভাল রেজাল্ট করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহ যার যার স্বপ্ন ময় জায়গায় নিজেকে আবিষ্কার করবে।

এসব কিছুর মাঝেই চলবে কিছুদিন জীবন। এরপর দুই এক বছর কেটে যাবে এক ঘোরে।এখন এসে আমাদের বুদ্ধি হয়ে যাবে যথেষ্ট। আমরা বুঝতে শিখবো আলাদা আলাদা করে জীবনের চাহিদা, তাগিদ, জীবনের মর্মতা।
কে আমাদের কে ভালবাসে, কে আমাদের ভাল বাসে না স্নেহ করেনা,কে সঠিক পথ দেখায়, কে বিপদে পাশে থাকে কে প্রয়োজনে ব্যবহার করে,কে বিনা প্রয়োজনে কষ্ট দেয়,কার কাছে যাওয়া উচিত, কার কাছে উচিত না,কোথায় গেলে ঠিক হবে কোথায় গেলে ঠিক হবেনা তা, আমাদের এখন কি করা উচিত। কারণ এখন একটা সারভাইভাল জীবনের দেখা পাবো।নিজেকে পুরোপুরি বুঝতে শিখবো। চারপাশ কে বুঝতে শিখবো।বাবা -মাকে বুঝতে শিখবো।পরিবেশ টা সম্পুর্ন আলাদা হয়ে যাবে। এমন মনে হবে যে পরিবেশটা কেমন খাপ ছাড়া।কারণ তখন আমাদের যথেষ্ট বয়স হয়ে যাবে।আমরা বুঝবো না যে পরিবেশ আমাদের জন্য খাপছাড়া নাকি আমরা পরিবেশের জন্য খাপ ছাড়া।এই সময় টাতে আমরা সেই শৈশব থেকে এখন অন্ধি কি পেয়েছি কি পাইনি। কি ভূল করে এসেছি কোথায় কি করা উচিত ছিল কি ছিলনা সব আমরা হিসেব করতে বসে যাবো।

হিসেব টা বোধহয় এই জন্যই করি বয়স টা তখন প্রায় বাইশ চব্বিশের দিকে এসে যায়, আর এই সময়টা বাবা-মায়ের কাছে আমরা ঠিক বোঝা হয়ে যাইনা কিন্তু এর চেয়ে কম কিছুও না।
বাবা-মা একটা নির্দিষ্ট বয়সে চলে আসবে।

যে বয়সে বাবা মা চায় আমরা কিছু একটা করি আমরা যদি মেয়ে হয়ে থাকি বাবা -মা চাইবে ভাল একটা জামাই দিতে যে মেয়েটাকে আমরণ সুশৃঙ্খল ভাবে বয়ে যেন নিয়ে যায় আমরা মরার পর সে যেন সুখে থাকে।তার যেন কোন দুংখ না হয়।তাকে একটা ভাল জামাই দেওয়াটা যেন তাদের মুখ্য ভূমিকা হয়ে ওঠে,আর অন্যদিকে হয় যদি সে ছেলে তবে সে যেন এখন ধীরে ধীরে সংসারে ভাড়ি বোঝাটা তার মাথায় নেয়,এইসব কিছু মিলেই যেন জীবনের এক তাগিদ চলে আসে মেয়ে আমার বড় হয়ে গেল, পড়াশোনা করেইবা কি চাকরি করবে, বয়স হয়ে যাইতেছে তার জন্য একটা কাউকে দরকার যে তার ইজ্জতের দেখা শোনা ভরণ পোশনের দেখাশোনা করে এমন কাউকে দরকার।

যে তাকে কষ্ট দিবেনা এমন কাউকে দরকার।পাড়াপ্রতিবেশির কথা বাবা-মাকে ঘায়েল করে ঠিক এই সময় সব দিক থেকেই যেন ছেলে মেয়ে এক জীবনের এক চরম পর্যায়ে চলে যায়
সব কিছু আশে পাশের সব কিছু যেন তেতো লাগে, ঠিক এই সময়টাতেই মনে হয় আবেগের আর তেমন কোন জায়গা নেই,এখন এই সময় একজন মেয়ের জন্য দরকার একজন প্রকৃত বন্ধু যে এই মন খারাপে পাশে বসে স্মুথলি তাকে সাহস জুগিয়ে সামনের পথটা এগিয়ে নিয়ে যাবার। যেন শেষ দিকে এসে স্বপ্ন গুলি ঝরে না যায়,পড়াশোনা করে যেন একটা কিছু করার রাস্তা পায় সেল্ফ ডিপেন্ডেবল হয়।এইটা যেন জরুরি সমাজের কাছে। কিন্তু আমাদের।সমাজ তো এতটুকু সুযোগ দেয়না।

বাবা-মায়ের সাথে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যখন মন টা বিষন্নতার সাগরে ডুবে থাকবে ঠিক তখনি কাউকে দরকার পড়ে আর এই সময়েই আমরা প্রকৃত কাউকে পাইনা।খুব কম মানুষি পেয়েছে এই চরম সময়ে কাউকে।
কাউকে দরকার পড়ে যে ছোট ছোট খুশি কে মনে রেখে সারপ্রাইজ দিবে কখনো বা তুমি চল আমি আছি বলবে চোখ বন্ধ করে তার কাছে সব সমস্যা বলতে পারবে।

আর অন্যদিকে এই সময়ে একটা ছেলের দরকার পড়ে একটা চাকুরির।কখন একটা চাকুরি হবে আর বাবা-মাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করবে।দিন কে দিন আর বাবা মায়ের কষ্ট ভরার যন্ত্রনার কথা শুনতে হবে না।
এই সময়ের জন্য হলেও একজন সাহস দেবার জন্য প্রকৃত বন্ধুই দরকার পড়ে।যার হাসি দেখে শান্তিতে ঘুমানো যায় আর এই সময় ই স্কুল জীবনের কথা চরম ভাবে মনের কোনে ভেসে ঊঠে কারণ এখনো আমরা অসহায় তখনো ছিলাম অসহায়।

মনে হতে থাকে এত মানুষের মধ্যে আমার একজন নির্দিষ্ট একজন নেই যে আমার পাশে দাঁড়াবে। আমাদের জীবনের হিসেব করতে গিয়ে মনে হয় স্কুল জীবনের সেই বন্ধুটাই আমার সব চেয়ে প্রিয় একজন ছিল যে আমাকে পড়তে উৎসাহিত করতো,পরিক্ষার আগে আমাকে হ্যান্ডনোট দিতো,আমার পাশে এসে বসতো কোন রকম স্বার্থ ছাড়াই।

যার সাথে আমি ছেলেমানুষী করতে পারতাম অবাধে এদিক ওদিক দৌড়াতে পারতাম।মনের কথা বলতে পারতাম।
আসলে আমরা কেউ ই বুঝিনা ইন্টারমিডিয়েট সময়ে কাউকে প্রয়োজন নাই, আবেগের সময়ে কাউকে প্রয়োজন নেই প্রয়োজন থাকে কাউকে এই সময়টাতে যে সময়ে যে স্বপ্ন গুলাকে বাস্তবায়ন হতে পাশে থাকবে,বাস্তব জীবনের দুংখ গুলাকে সাথে ভাগ করে নিবে।হাত ধরে বাকি পথ টা পাড়ি দিবে বিনা স্বার্থে।