কিশোরগঞ্জের হাওরে আগাম বন্যায় পানির নিচে বোরো ধান; দুঃস্বপ্নে কৃষক

2 months ago
3:45 pm
505
অন্যান্য পরিবেশ ও কৃষি কিশোরগঞ্জের হাওরে আগাম বন্যায় পানির নিচে বোরো ধান; দুঃস্বপ্নে কৃষক

দেশের অন্যতম খাদ্য ভান্ডার হিসেবে খ্যাত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল। দেশের ধানের চাহিদার প্রায় ৩০ ভাগ পুরণ হয় হাওরাঞ্চল থেকে। এ অঞ্চলের ৭০ ভাগ মানুষ কৃষিজীবি। যে ফসলের উপর নির্ভর করে সংসার চলে সে ফসল আগাম বন্যায় তলিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনেই। স্বপ্ন পরিনত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে বলে ধারণার করছে কৃষি বিভাগ।

গত শনিবার (০২ এপ্রিল) বিকাল থেকেই উজানের পানি এসে ঢুকছে বিভিন্ন হাওরে। ইটনার নদীর তীরবর্তী চরগুলো তলিয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের জল ফেলা ছাড়া কোন কিছুই করতে পারছে না কৃষকেরা। চর এলাকায় পানির নিচে তলিয়ে গেছে কাঁচা-পাকা বোরো ধান। এসব ধান অপুষ্ট থাকায় তা কৃষকের কোন কাজে আসবে না।

আগাম বন্যার পানি প্রবেশ করছে ইটনা উপজেলার বাদলা হাওরে, এরশাদনগর, আলালের বন, ধনপুর, বেতেগাসহ এলংজুরী ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওরে ও করিমগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন হাওরে। কৃষি বিভাগ বলছে মূল হাওরগুলোতে এখনো পানি ঢুকেনি। শুধুমাত্র নদীর তীরবর্তী চরগুলো ডুবেছে। জনপ্রতিনিধিরা ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় মেরামতের জন্য মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিচ্ছেন।

ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামের কৃষক মাফিক মিয়া জানান, বাহিরচর হাওরে ৪০ শতাংশ জমিতে বোরো ধান চাষ করেছিলাম। শনিবার বিকাল থেকেই পানি ঢুকতে শুরু করেছে। সকালেও দেখে এসেছিলাম জমির অবস্থা ভাল। এ অবস্থায় জমির ধানও ভাল করে পাকেনি যে কেটে আনবো। সবেমাত্র পাকতে শুরু করেছে এর মধ্যেই এই অবস্থা।

কৃষক মন্নান মিয়া জানান, অন্যের জমি পত্তন নিয়ে পাঙ্গাশিয়া হাওরে চার একর জমি চাষ করেছি। অকাল বন্যায় আমার ৪ একর জমিই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পথে। সকালে যদি পানি না বাড়ে তবে কিছুটা জমি কাটতে পারবো। আর যদি রাতে রাতে পানি বেড়ে যায় তাহলে সব হারিয়ে ফেলব।

কয়েকজন কৃষক জানান, তারা অন্যের জমি চাষ করেছেন টাকার বিনিময়ে। মূল হাওরের জমিজমা রাখতে গেলে বেশি টাকা লাগে, সেই পরিমাণ টাকা আমাদের নাই। তাই কম টাকার এই জমিগুলো চাষ করি। পরিশ্রম একটু বেশি লাগলেও ফসল ভাল হয়। সারা বছর শ্রম ঘাম দিয়ে জমিতে ফসল ফলিয়েছি। আর এখন চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। দুচোখ ভরে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছি না। করোনার কারণে বাড়ির বাহিরে কোথাও গিয়ে কিছু করতে পারিনি। কৃষি জমিই আমাদের একমাত্র সম্বল। কিন্তু আগাম বন্যায় সেই সম্বলও ডুবে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, মেঘালয়, আসামের বিভিন্ন জায়গায় ২৬৭ মিলিমিটার পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টির পানি এসে হাওরে ঢুকছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে আগামী ২৪ ঘন্টায় বৃষ্টি সম্ভাবনা নেই। তারপরেও যে পরিমাণ পানি ঢুকেছে তাতেই আমরা আতঙ্কে আছি। আগামী ২৪ ঘন্টা পরে যদি বৃষ্টি হয় তবে বিভিন্ন হাওর তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। রবিবার দুপুর নাগাদ ইটনার ধনু নদীর পানিতে চরের নিম্নাঞ্চলের জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে আরও এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা বোরো ধান কৃষক কাটার চেষ্টা করছে। পানির স্রোত বেশি থাকায় তাও সম্ভব হচ্ছে না। যে সমস্ত জমির বোরো ধান ৮০ ভাগ পেকেছে তা দ্রুত কৃষকদেরকে কেটে ফেলার অনুরোধ জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ছাইফুল আলম জানান, পাহাড়ি ঢলে ইটনার নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল এলাকার অনেক বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। তবে কী পরিমাণ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ মুহুর্তে বলা যাচ্ছে না। আমার দুই জন কর্মকর্তা ইটনার হাওরে অবস্থান করছেন। আশা করছি আর বৃষ্টি না হলে ফসলের ক্ষতি হবে না।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান জানান, হাওরের ৭৩টি ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। তবে জমি অধিগ্রহণ শেষ না হওয়ায় প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ১২টি বড় ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্প এখনো শেষ হয়নি। এগুলোর কাজ চলমান আছে।

ছবি- রাকিবুল হাসান রোকেল।