কিশোরগঞ্জে ধানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

2 weeks ago
7:47 pm
112
অন্যান্য পরিবেশ ও কৃষি কিশোরগঞ্জে ধানের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক

কিশোরগঞ্জের হাওরে এ বছর উজানের ঢলে প্রায় ৩৭৯ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছিল। উজানের পানির কারণে আধা পাকা বোরো ধানই সে সময় ঘরে তুলেছিল কৃষক। জেলায় এখন পর্যন্ত ৮১% ধান কাটা হয়েছে। ইতিমধ্যে হাওরে ৯৫% ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। শত বাধা বিপত্তি উতরিয়ে কৃষকেরা বোরো ধান ঘরে তুলতে পেরেছে। যদিও দালাল, ফরিয়া এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ধানের প্রকৃত মূল্য পাবেন না বলে ধারণা করছে কৃষকরা। সরকার ১৯ এপ্রিল থেকে সরকারিভাবে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের ঘোষণা দিলেও বাস্তব অর্থে তা কাগজ কলমেই সীমাবদ্ধ। এ বছর কিশোরগঞ্জ জেলায় বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬৬ হাজার ৪৮৫ হেক্টর নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে তুলণামূলকভাবে বেশি। আবাদের আওতায় আসে ১ লাখ ৬৭ হাজার ১৯০ হেক্টর জমি।

হাওরে ৯ মে পর্যন্ত নিম্ন এলাকায় ৯৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। উজান এলাকায় ৫৭ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। বৈশাখের তাপদাহে কৃষকের কষ্টার্জিত ফসল বোরো ধানের দাম নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এবার জেলার ১৩টি উপজেলায় ১০৮০ টাকা মণ দরে অর্থাৎ ২৭ টাকা কেজি দরে ২৩ হাজার ১৭৬ মেট্রিক টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরজমিনে দেখা যায়, হাওর থেকে নৌকায় করে চামটা নৌ-বন্দরে আসছে হাজার হাজার মেট্রিক টন ধান। নদীর পাড় থেকে ট্রাকে করে পরিবহন করা হচ্ছে সড়ক পথে। এমন দৃশ্য চোখে পড়বে হাওরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার চামটা নৌ-বন্দরে। বন্দরের ঘাটে প্রায় ৫০টি আড়তে চলছে নতুন ধান কেনা-বেচা। কিছু কৃষক ধান কাটার পর আধাপাকা ও অপুষ্ট ধান বিক্রি করা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। ধানের দাম মণ প্রতি ৫০০-৬০০ টাকা। অথচ এই ধান কাটতে প্রত্যেক কৃষককে ৬০০ টাকা করে গুণতে হয়েছে। তার উপর ধানের উৎপাদিত খরচ ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকা। কৃষক লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বেশি। কেননা অপুষ্ট ধান থেকে চাউল হওয়ার সম্ভাবনা কম এবং গরুর খাবার খড়-বিচালী রক্ষায় কৃষকেরা নিতান্তই বাধ্য হয়েছে। তবে ধানের দাম কম থাকায় কৃষকরা দিশেহারা। দাম নিয়ে কৃষকরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।

আড়তগুলোতে প্রতি মণ মোটা ধান ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং চিকন ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাকা ও ৯৫% শুকনো ধান সর্বোচ্চ ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতিদিন কিশোরগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী জেলার নানা স্থান থেকে নতুন ধান আসতে শুরু করেছে। হাওরের সঙ্গে নদীপথে চামড়াঘাট ও ভৈরব বাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ থাকায় ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ ধান আমদানি হচ্ছে। এই দুই বাজারের শতাধিক আড়তে এসব ধান বিক্রি হচ্ছে।

ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারের কৃষক শহিদ মিয়া জানান, কৃষকরা প্রত্যাশিত দাম পাচ্ছিনা। জমিতে ফসল ফলাতে প্রতিমণ ধান খরচ হয়েছে হাজার টাকারও বেশি। অথচ বাজারে গিয়ে আমরা বাধ্য হয়ে লোকসানে ধান বিক্রি করছি।

ধান বিক্রেতা সুলতান জানান, তার ৩৫ শতাংশ জমিতে ধান ফলাতে খরচ পড়ে ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। আর প্রতি ৩৫ শতাংশ জমিতে ধান উৎপাদন হয় ১৭ থেকে ১৮ মণ। উৎপাদিত ধান বর্তমান বাজার দরে বিক্রি করলে কিছুই থাকছে না।

আড়ৎ মালিক মো. কবির হোসেন জানান, উজানের ঢলের পানিতে কিছুটা আতংক কৃষকের মাঝে ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত তেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। কৃষক মাঠের ধান কেটে মাড়াই, ঝাড়াই ও শুকানোর কাজ শেষে ঘরে ধান নিয়ে ফিরতে পেরেছেন। ধানের দাম আরও বাড়তে পারে। তাই কৃষকরা এবার ধান বিক্রি করছেন কম। মজুদের জন্য বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন।

অপরদিকে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান বিক্রিতে কৃষকদের আগ্রহ কম থাকায় এবার ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কিনা-এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আব্দুস সাত্তার জানান, চলতি বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৭ মেট্রিক টন। তবে ধারণা করছি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এর আগেও চেষ্টা করা হয়েছে। চলতি বছর সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসার, খাদ্য নিয়ন্ত্রক, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধিগণদের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছি যেন সরকারিভাবে বেশি বেশি ধান ক্রয় করা যায়। গত বোরো মৌসুমে অনেক জেলা থেকে আমরা ভাল করেছি। দালাল, ফারিয়া এখন নাই। অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে কৃষকেরা ধান বিক্রি করতে পারবে। আমরা বেশি ধান ক্রয় করতে পারলে সরকার বেশি মজুদ করতে পারবে।