অ্যান্টি-মাস্ক লীগ

4 months ago
11:40 pm
36
অন্যান্য কলাম অ্যান্টি-মাস্ক লীগ

করোনা ভাইরাসের আক্রমণে চীন, ইতালি, স্পেন যখন বিপর্যস্ত তখনই আমাদের দেশের মানুষরা এই ভাইরাসের নাম শুনতে শুরু করে। ইবোলা ভাইরাস সহ আরো অনেক ভাইরাস পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে বারবার হানা দিলেও মহামারী আকারে ছড়িয়ে না পড়ায় আমাদের দেশের মানুষ করোনা ভাইরাসকে স্প্যানিশ ফ্লু আর প্লেগের মতো করে দেখতে অভ্যস্ত হয়নি। আমাদের দেশের মানুষ হয়তো এখনো ভেবেছে করোনা ভাইরাস কয়েকদিন হয়তো টপ নিউজগুলোর জায়গা দখল করে রাখবে তারপরই হবে সব লাপাত্তা। আমাদের দেশের মানুষেরা কখনো ভাবতেই পারেনি যে তাদেরকে পাশের দেশের, পাশের বিভাগের,পাশের জেলার কিংবা পাশের গ্রামের মানুষগুলোর মৃত্যুর সংখ্যা হিসাব করতে হবে প্রতিদিন।

চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস স্বল্প সময়ে পৃথিবীর অসংখ্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তার মধ্যে পৃথিবীর শক্তিশালী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোও বাদ পড়েনি। এমনকি যেসব দেশ গুলো চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্য অধিক প্রশংসিত তারা ও। উন্নত দেশগুলো প্রথম দিকটায় এই ভাইরাসকে সর্দি কাশির মতোই সামান্যতম অসুখ বলে অবজ্ঞা করে এসেছিল। স্বাস্থ্যকর্মীরাও হাসপাতালের এসব রোগীদের কে বিনা পিপিই ও মাস্ক ছাড়াই চিকিৎসা দিয়েছেন। যখনই স্বল্প সময়ে রোগীর সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বেড়ে যায় তখনই ব্যাপারটি তাদের সকলের নজরে আসে। তখন সে সব দেশের সরকার দেশে লকডাউন ঘোষণা করা শুরু করে। এমতাবস্থায় ঘর থেকে বিনা কারণে বের হলে জরিমানা কিংবা শাস্তির ব্যবস্থা ঘোষণা করে অনেক দেশের সরকার। রাস্তাঘাটে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীরা টহল দিতে শুর“ করে।

ক্ষণিকের মধ্যেই এই ভাইরাস দু’শরও অধিক দেশে আক্রমণ করা শুরু করে। আমাদের বাংলাদেশও বাদ যায়নি এতে। যাইহোক অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও লকডাউন জারিসহ বিনা কারণে ঘর থেকে বের হলে শাস্তির ব্যবস্থা ঘোষণা করে দেয় সরকার এবং যদিও কোন জরুরী কাজে কাউকে ঘর থেকে বের হতেই হয় তবে সে যেন মাস্ক পরিহিত অবস্থায় বের হয়। মাস্ক ছাড়া কোন মানুষকে রাস্তাঘাটে দেখলেই নিরাপত্তা বাহিনীরা তাদেরকে শাস্তিও দিতে শুর“ করে। মাস্ক পরিধানে মানুষের উপর যতই জোর প্রদান করা হচ্ছিল মানুষকে ততোই অনীহা করতে দেখা যাচ্ছিল। আচ্ছা এতোটুকু পাঠ করেও সচেতন পাঠকের মনে কি একবারের জন্যেও এই প্রশ্নের উদয় হয়নি যে এত কঠোর নিয়ম জারি করার পরেও কেন এসব মানুষেরা মাস্ক পরিধানে অনীহা করছিল? চলুন সংক্ষেপে জেনে আসা যাক ৫-১০ কোটি মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে থাকা স্প্যানিশ ফ্লু তে মানুষ মাস্ক পরিধানে কতটা উদগ্রীব ছিল?

স্প্যানিশ ফ্লু। এই মহামারীর নামকরণ শুনে অনেকেই ভাবতে পারেন হয়তো স্পেনেই এই রোগের আবির্ভাব হয়েছিল।আসলে তা নয়, সংবাদমাধ্যম অনেকটা অন্যায়ভাবেই গণমাধ্যমে এই নাম প্রচার করেছিল। স্প্যানিশ ফ্লুয়ে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বা ৫ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। শুধুমাত্র আমেরিকাতেই ৬ লক্ষ ৭৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। যা তাদের প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মৃতের চেয়েও সংখ্যায় অনেক বেশি। ব্রিটেনে মৃত্যুবরণ করে ২ লক্ষ ২৫ হাজার। ব্রিটিশ এর আয়ত্তাধীন ভারতবর্ষও এর থেকে রেহাই পায়নি। শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই মৃতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি।

উন্নত ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের মৃতের সংখ্যা কি আপনাকে অবাক করে দিচ্ছে?এমন পাহাড়সম মৃতের সংখ্যার কারণটা কি আপনার জেনে নিতে ইচ্ছে করছে? চলুন এমন কিছু কারণ জেনে নেয়া যাক যা তাদের এই পাহাড়সম মৃতের সংখ্যার জন্য যুক্তিযুক্ত কারণ ছিল। আপনাকে এই তথ্যটি দিলে আপনি কি খুব বেশি বিষ্মিত হবেন যে তখন কিছু আমেরিকান “এন্টি-মাস্ক লীগ” নামেও একটি দল গঠন করেছিল!’এন্টি-মাস্ক লীগ’ মাঝেমধ্যেই সভা মিছিলের আয়োজন করত শুধুমাত্র মাস্ক পড়া থেকে বিরত থাকার জন্য। তখন তারা যুক্তি দিচ্ছিল যে মাস্ক পরিধান করা অস্বস্তিকর এবং এতে ব্যক্তি স্বাধীনতাও নষ্ট হয়।আবার কেউ কেউ যুক্তি দিচ্ছিল যে মাস্ক পরিধান করে একে অপরকে ভয় দেখাতে পারে তাই তারা মাস্ক পরিধান করবে না। এরকমই অনেক হাস্যকর যুক্তি তারা নিরাপত্তাকর্মীদের দেখাতো যাতে মাস্ক পরিধান করতে না হয়।

ন্যান্সি আমেরিকায় স্প্যানিশ ফ্লু নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন,”অনেক লোক বির“দ্ধাচরণ করতো কারণ তারা বলাবলি করতো মাস্ক পরে লোকজন একে অপরকে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে। এবং সে সময় কর্তৃপক্ষ তাদেরকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করতো। তবে আমি মনে করি এটি নেহাতি একটি অজুহাত ছিল। কারণ অনেকেই চাইতো না কেউ মাস্ক পরিধান কর“ক।”

যাই হোক রোগের প্রাদুর্ভাব যখন বেড়ে চলছিল মার্কিনীরা মাস্ক পরিধানের গুর“ত্ব কিছুটা বুঝতে শুর“ করেছিল। গজ কাপড় দিয়ে মাস্ক বানানো শুর“ করে সকালে।কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান খবরের কাগজের মাধ্যমে কিভাবে সহজ উপায়ে মাস্ক তৈরি করা যায় তা শিখিয়ে দিচ্ছিল। এতেই কি আপনি ধরে নিচ্ছেন যে তারা সুধরে গিয়েছিল? বোধহয় ‘না’ শব্দটিই এর উপযুক্ত উত্তর হবে।তখন তারা মাস্কে ফুটো করে রাখতো যাতে করে তারা সহজেই ধূমপানের কাজটুকু সেরে নিতে পারে।

অনেকেই ফ্যাশনেবল করে তাদের মাস্কগুলোকে তৈরি করে ব্যবহার করত যাতে তারা অন্ততপক্ষে এটা বোঝাতে পারে যে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদের আদেশ মতো মাস্ক ব্যবহার করছে।যাইহোক গজ কাপড়ের মাস্ক ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস রোধ করতে পারে না বলে বিশেষজ্ঞদের মাঝে বিতর্ক হচ্ছিল।

এমন বিতর্কের মাঝে বিস্ফোরক বক্তব্য দেন ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্যপ্রধান জে. ডবি­উ ইনচেস! তার মতে, মাস্কের ভেতরের ছিদ্রগুলো ফ্লু মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। জনসমাগম হয় এমন জায়গায় গজ মাস্ক কার্যকরী নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যদিও ফিনিক্স শহরের বেশিরভাগ নাগরিক স্বাস্থ্যবিধি এবং নির্দেশনা অনুসারে মাস্ক ব্যবহার করেছিল। তবে কিছু লোক ধূমপানের উদ্দেশ্যে মাস্কে ছোট্ট ফুটো করে রাখত। এতে করে মাস্কটি পুরোপুরি কার্যকারিতা হারিয়ে বাতিল হয়ে যেত।

স্বাস্থ্যবিভাগের একজন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করে মাস্ক পরতে অস্বীকৃতি জানায় একজন মার্কিন নাগরিক। সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করে হত্যা করেন তিনি। সেই সঙ্গে দুজন প্রত্যক্ষদর্শীকেও গুলি করেন ঐ কর্মকর্তা। এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা। এতে করে মার্কিন নাগরিকদের মনে সচেতনতার সূত্রপাত ঘটতে শুর“ করে। ধীরে ধীরে রোগের প্রাদুর্ভাব ও কমতে থাকে। তখন আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে যোদ্ধারা যখন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছিল তাতে আবার তাদের রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে গিয়েছিল।

সত্যি বলতে কি ১৯১৮ সালে ছড়িয়ে পড়া এই মহামারীর মূলে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস ছিল তা আবিষ্কার করতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে আসে।ফলে ভ্যাক্সিন তৈরির তো প্রশ্নই আসে না।এই মহামারীর কারণে এত মানুষের মৃত্যুর পেছনে হয়তো এটিও একটি সম্ভাব্য কারণ।

ইতোমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস কে মহামারী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে।এই মহামারীর সকল দিক বিশেষ করে মানুষের আচার-ব্যবহার ১৯১৮ সালে ছড়িয়ে পড়া স্প্যানিশ ফ্লুয়ের সময়কার মানুষদের আচার-ব্যবহার এর সাথে সাদৃশ্য পাওয়া যায়।এই বিষয়গুলোও কি আমাদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে না???শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই মহামারী প্রায় ২১৩ টি দেশে আক্রমণ করেছে এবং সোয়া কোটি আক্রান্তের সাথে প্রায় ৫ লক্ষ ৪৮ হাজার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

বুঝতেই পারছেন সব সময় সকল স্থানে এমন কিছু অসচেতন মানুষ বিদ্যমান থাকে যাদের উপরে সচেতন মানুষদের নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। আর তাদের কারণেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করাটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তবে তাতেও কিন্তু মহামারী একদিন ঠিকই থেমে যায়। শুধু মৃত্যুর তালিকাটা হয়ে পড়ে দীর্ঘ।এক্ষেত্রে কিছু মানুষই পারে আমাদের প্রিয় মানুষগুলোর জীবন র“খে দিতে। আমি চাইনা এই পাঠের পাঠকেরা উপরে বর্ণিত নিন্দিত মানুষদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হোক। পরিশেষে এই কথাই বলে শেষ করব,”সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন ও আপনার সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।”

লেখকঃ- মোঃ উসমান গনি রাসেল
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
বিভাগ:সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং।