অনলাইনে শিক্ষাপদ্ধতির ফলে থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের কুফলতা ও সুফলতা

4 months ago
6:43 pm
47
অন্যান্য কলাম অনলাইনে শিক্ষাপদ্ধতির ফলে থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের কুফলতা ও সুফলতা

সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষের বিনোদন ছিল নাচ গান অভিনয়। মানুষ পশু শিকারের পর তা অভিনয় করে পরিবারের সদস্যদের সরাসরি দেখাত। মূলত সেখান থেকেই অভিনয় বা থিয়েটারের প্রচলন শুরু হয়। সময়ের বিবর্তনে থিয়েটার আধুনিক পর্যায়ে পদার্পণ করে। থিয়েটার শুধু মাত্র বিনোদনের মাধ্যমই রইলো না এটি শিক্ষা ক্ষেত্রেও পদার্পণ করতে থাকল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিতেও থিয়েটার জায়গা দখল করে নিল। স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি পিএইচডিতেও থিয়েটারের বিভিন্ন বিষয় সংযুক্ত হল।

এবার আসি বর্তমান সমস্যা কোভিড ১৯ করোনা ভাইরাসের সময়ে থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের থিয়েটার করন ও একাডেমিক শিক্ষায় সুবিধা ও অসুবিধা সমূহ নিয়ে –
আমরা সবাই জানি যে এই করোনা কালীন সময়ে প্রতিটি মানুষ ঘর বন্দী জীবন যাপন করছে। ফলে পূর্বের মতন আর স্বাভাবিক জীবন ব্যবস্থা আর তেমন ঠিক নেই। ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে তাদের সবাই ঘরে থাকাটাই শ্রেয় মনে করছেন। এটি নিঃসন্দেহে সত্য।

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিষয় যেমন বাংলা, ইংরেজি, ইকোনোমিক, পপুলেশন সাইন্স ইত্যাদি বিষয়ের মত থিয়েটারও একটা বিষয় যেখানে অভিনয়ের পাশাপাশি সেট, লাইট, কস্টিউম ও পাপেট সহ আরো নানা ধরনের ব্যবহারিক বিষয়গুলো হাতে ধরে শেখানো হয়। যেটি একজন থিয়েটারের একাডেমিশিয়ান বা একজন থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে।
এই সকল থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য বর্তমান সময়ে একটা বিকল্প ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা হল অনলাইন ক্লাস পদ্ধতি। অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে হয়ত তার অসুবিধা হলেও খুব কম। কিন্তু থিয়েটারের পড়াশোনা অনেককটা কাদা মাটি দিয়ে হাড়িঁ বানানোর মত।

এখন আসা যাক থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের অনলাইন ভিত্তিক পড়াশোনার অসুবিধা সমূহ –
প্রথমেই বলা যায় নেটওয়ার্কিং সমস্যা, দেখা যায় অনলাইনে ক্লাস করা হয় বা নেওয়া হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফলে এই সকল ইন্টারনেট চালিত করা হয় মোবাইলের বিভিন্ন সিম কার্ডের দ্বারা। ফলে এতে প্যাকেজ ডাটা যতক্ষণ থাকবে ততক্ষনই ক্লাসের সুবিধা পাওয়া যাবে। ডাটা শেষ হলেই ক্লাস হতে বঞ্চিত হতে হয়। এরপর ক্লাস চলাকালীন সময়ে নেটওয়ার্ক কেটে যাওয়ার প্রবনতা ত থাকেই। যে সকল শিক্ষার্থীরা প্রান্তিক অঞ্চল গুলোতে থাকে তাদের জন্য নেটওয়ার্ক সমস্যা থাকে অনেক বেশি ফলে তারা অনলাইন ক্লাস গুলো থেকে পিছিয়ে পড়ছে অবিরত।

থিয়েটারের বিভিন্ন কর্ম প্রক্রিয়া গুলোর মধ্যে বেশির ভাগই ব্যবহারিক কর্ম প্রক্রিয়া যেমন – Acting, Disigning ( Set design, light design, costume design and making props) ইত্যাদি বিষয়গুলো একদমই হাতে কলমে শেখার মত বিষয়। এই বিষয় গুলো যদি শিক্ষকের সরাসরি দ্বারস্থ না হয়ে করা হয় তবে তা সঠিক ভাবে শেখা ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়ে উঠে না। সুতরাং অনলাইনে তা করার সুযোগটা শিক্ষার্থীরা সহজেই পাচ্ছে না।

এরপর আসা যাক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় সম্পর্কে – থিয়েটার কোন মুখস্থ বিদ্যা নয় এটি পুরোপুরি সাইকোলজিক্যালের সাথে সম্পৃক্ত। কেননা যখন কোন একজন একটি নাটকের চরিত্রায়ন বা পোশাকের ডিজাইন বা লাইট ডিজাইন করবে তাকে সেই চরিত্রের মানসিক অবস্থা বুঝতে হবে।

বর্তমানে যারা থিয়েটারের নব্য শিক্ষার্থী তাদের জন্য এটি কষ্ট সাধ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ তারা জানে না থিয়েটারের কাজ গুলো আসলে কিভাবে করতে হয়। আর যারা পূর্বে থেকেই থিয়েটারের কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত তাদের জন্য অনলাইনে কাজ গুলো করা বেশ কঠিন হয়ে পড়ছে । কারন থিয়েটার সাবজেক্টে তত্ত্বীয় ধারণার চেয়ে ব্যবহারিক বা প্র্যাক্টিকাল কাজ গুলো বেশি করা হয়।

লাইটের প্রতিটি বার, সুইচ, বাল্ব,কন্ট্রোল বোর্ড ও ডিমার ইত্যাদি ব্যবহার করে জানতে হয় বা শিখতে হয় সেটা অনলাইন ক্লাসে করানো তেমন হচ্ছে না ফলে সেটাও সঠিক শেখা যাচ্ছে না।

হ্যাঁ অনেকেই বলবে যে ইউটিউবে এখন সব কিছুরই ভিডিও পাওয়া যায় খুব সহজেই সব কিছু শেখা যায়। তবে এখানে একটু বলার আছে , তা হল ইউটিউব হতে পারে যে কোন বিষয়ের সলুশন কিন্তু একজন শিক্ষক সরাসরি একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে যেভাবে বোঝানোর সক্ষমতা রাখেন ইউটিউব কি তা আদৌ সে ভূমিকা রাখতে পারে? আমি বলব না !! একজন ছাত্র বা ছাত্রীর বা থিয়েটারের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অনলাইন বা ইউটিউব কখনো সম্পূর্ণ মানসিক বিকাশে পরিপূরকের কাজ করতে পারে না। যা স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিক ভাবে সরাসরি শিক্ষাটা দিতে পারে।

অনলাইনে থিয়েটারের শিক্ষায় সুফলও রয়েছে যেমন সোশ্যাল বিভিন্ন মিডিয়া যেমন হোয়াটস এ্যাপ, মেসেঞ্জার , ইমো ,ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব লাইভ , গুগোল ক্লাস ইত্যাদিতে বিভিন্ন কন্টেন্ট রেকর্ডিং করে পাঠানো হচ্ছে ফলে কোন না কোন সময় শিক্ষার্থীরা সেটি ঠিক খুঁজে পাচ্ছে । যেটা হয়ত সরাসরি ক্লাসটাতে নাও পেতে পারত । হয়ত দেখা যায় ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০জন শিক্ষার্থী ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার ফলে সেই ১০জনের ক্লাসটা সম্পর্কে অনবগত থাকত কিন্তু রেকর্ডিং থাকার ফলে সেটি সম্পর্কেও তারা অবগত থাকতে পারছে। কিন্তু স্টোরে রয়েছে ভেবে তারা পরে দেখবে ভেবে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
কিন্তু এই মহামারীর সময়ে এছাড়া আর কোন উপায় হয়ত আমাদের কাছে নেই । যদি গ্রোটোস্কি, স্তানিস্লাভস্কি ,মায়ার হোল্ড, অগাস্তবোয়াল জানতেন যে এমন একটি সংকট কালীন সময় আসবে পৃথিবীতে তাহলে হয়ত তারা কোন না কোন পদ্ধতির কথাও বলে যেতেন । যাদের থিয়েটারের ইতিহাস আমরা আজও পড়ি নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। এত সংকটের মধ্যেও জয় হোক থিয়েটারে যাইহোক সব শেষে একটাই বক্তব্য তা হল থিয়েটারের চর্চা চলবে চলছে। থিয়েটারের শিক্ষার্থীরা শুধু নয় সকল থিয়েটার প্রেমিরা এই থিয়েটারকে ভালবেসে এই থিয়েটারের চর্চা অব্যহত রাখতে সচেষ্ট ভূমিকা রাখছে। এত সংকটের মধ্যেও জয় হোক থিয়েটারের, জয় হোক শিল্পের, জয় হোক মানবতার। একদিন পৃথিবী সুস্থ হবে থিয়েটার ফিরে পাবে আপন প্রাণ।

 

লেখক…..
রোমানা রুমা
আই সি সি আর স্কলার
রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ( কলকাতা)
সহকারী পরিচালক, মুক্তমঞ্চ নাট্যদল ও নির্বাক দল গাজীপুর
সহ – সভাপতি, বাংলাদেশ – ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ স্টুডেন্ট অর্গানাইজেশান। ( বাংলাদেশ- ভারত)