ঘানির ঐতিহ্য আঁকড়ে আছেন মিজানুর

3 months ago
7:59 pm
39
অন্যান্য বিশেষ প্রতিবেদন ঘানির ঐতিহ্য আঁকড়ে আছেন মিজানুর

ঘানি, প্রাচীন বাংলার তেল উৎপাদনের একমাত্র অবলম্বনের নাম। একসময় গ্রামীণ জনপদে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেলের ঘ্রাণ পাওয়া যেতো। আবার ঘরে ঘরে এই তেলের ব্যবহারও ছিলো। কিন্তু প্রযুক্তির এই সময়ে কাঠের ঘানি আর খাঁটি সরিষার তেলের দেখা পাওয়া যেনো বিরল দৃশ্য। তবে শত বছরের ঘানির ঐতিহ্য ও বাপ-চাচার পৈতিৃক ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরেছেন কুষ্টিয়ার গ্রামীণ জনপদ কুমারখালীর বাসিন্দা মিজানুর রহমান। এতে করে শুধু মিজানুর নিজেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন না মানুষের জন্য খাঁটি সরিষার তেলও সরবরাহ করছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পাশে অবস্থিত কাঠের ঘানি থেকে মিজানুরের তত্ত্বা প্রতিদিন সরিষার তেল উৎপাদিত হচ্ছে।

ঘানির স্থান ঘুরে দেখা গেলো, ভারী বোঝা নিয়ে গরু ঘানির চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। গরুর চোখে মোটা কাপড়ের পর্দা দেওয়া। আর ঘানিতে রাখা সরিষা থেকে তেল চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। নিচে রাখা পাত্রে সেই তেল জমা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সেই তেল পাত্র থেকে উঠিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে খাঁটি সরিষার তেলের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ছে। ঘানির পাশেই ছোট্ট দোকান রয়েছে। সেখানে বসে মিজানুর ক্রেতাদের চাহিদামতো সরিষার তেল বিক্রি করছেন। সরিষা তেলের পাশাপাশি দোকানে ঘানিতে ভাঙ্গানো তিল ও কালোজিরার তেল পাওয়া যায়। সরিষার তেল প্রতি কেজি ২২০ টাকা আর লিটার হিসেবে ২০০ টাকা। আবার যে কেউ তিল, কালোজিরা ও সরিষা মিজানুরের ঘানি থেকে ভাঙ্গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে পারছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘ আট বছর বিদেশে ছিলেন মিজানুর। পরে দেশে ফিরে ঘানিতে তেল উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। প্রথমে টাকা ধার করে করে দুইটি গুরু কিনেন। দিনে দিনে তেলের চাহিদা বেড়ে গেলে আরো দুইটি গুরু কিনেন। আর দুইটি ঘানি তৈরি করতে তার ৭০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। ঘানি দেখভাল করার জন্য প্রতিদিন ৯০০ টাকা করে মজুরি দিতে হয়। দুইটি ঘানিতে ৯০ কেজি সরিষা থেকে ৩১ কেজি তেল উৎপাদিত হচ্ছে। ঘানির জন্য দেশি সরিষা মানিজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করা হয়। কুষ্টিয়া শহর, রাজবাড়ী, রাজশাহী, পাবনা ও ঝিনাইদহ থেকে নিয়মিত ক্রেতারা আসেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ফোন করে তেলের কথা জানালেও তেল পাঠানো হয়।

কুমারখালীর স্থানীয় ক্রেতারা বলছেন, বর্তমান সময়ে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি ভেজাল তেলে বাজার সয়লাব। আবার আসল-নকল তেলের বিজ্ঞাপনে মানুষ অতিষ্ঠ। সেখানে প্রাকৃতিকভাবে তেল উৎপাদন দেখে মানুষ আগ্রহের সঙ্গে সরিষার তেল কিনছেন। দুইটি ঘানি থেকে প্রতিদিনের উৎপাদিত তেল সব বিক্রি হয়ে যায়। দেশি সরিষা থেকে ভাঙ্গানো তেল বিশুদ্ধ হওয়ায় ক্রেতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন নাদিম সিদ্দিকী অভি। করোনাকালের সময়ে বাসায় থেকে সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন। সে ঘানি ভাঙ্গা সরিষার তেল সংগ্রহ করে পরিচিত গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করেন। মিজানুরের ঘানির দোকানের সামনে অভির সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, সরাসরি ঘানি থেকে উৎপাদিত তেলের প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। একইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতিতে তৈরি তেল নিরাপদ হওয়ায় অনেকেই ব্যবহার করেন। আর এখন তো সবখানে এ তেল পাওয়া যায় না। তাই আমি চেষ্টা করছি, ঘানি ভাঙ্গা তেল সংগ্রহ করে পৌঁছে দেওয়ার। এতে করে আমারও ভালো লাগে।

আরেকজন ক্রেতা শিশু বাচ্চার গায়ে মাখানোর জন্য তেল কিনতে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘানি ভাঙ্গা তেল দোকানে নামেই বিক্রি করা হয়। ভরসা করতে পারিনা তাই এখানে আসছি। শিশুদের শরীরে এ তেল ব্যবহারের অনেক উপকারিতা আছে বলে দাদী-নানীদের কাছ থেকে শুনেছি।

কথায় কথায় ঐতিহ্যপ্রেমী মিজানুর বললেন, বাপ-চাচারা ঘানি থেকে তেল তৈরি করতেন। মাঝে তেল উৎপাদন বন্ধ ছিলো এখন নয়মাস ধরে আমি শুরু করেছি। এরআগে আমি জীবিকার সন্ধানে দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুর কাছ থেকে বেঁচে আসি। দেশে ফিরে ভাবলাম বাপ-চাচার ঐতিহ্যকে ধরে কিছু করবো। যাতে করে নিজে ভালো কিছু খেতে পারি আবার অন্যকেও ভালো খাওয়াতে পারি। আসলে এখানে এটা (ঘানি) করতে যেয়ে অনেক সীমাবদ্ধতার মুখোমুখিও হয়েছি। আমার পেছনে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন।

ঘানি নিয়ে স্বপ্নের বিষয়ে বলেন, যতোদিন বেঁচে আছি বাপ-চাচার ঐতিহ্য ধরে রেখে মানুষের জন্য ভালো তেল তৈরি করতে চাই। মানুষকে ভেজালমুক্ত তেল খাওয়াতে চাই। আর যদি মানুষকে ভালো তেল না দিতে পারি তাহলে তো আর ঘানি চালাইতে পারবো না।