১৫ এপ্রিল ২০২৬


বৈশাখী শোভাযাত্রা: মঙ্গলে অমঙ্গল হয়না; আনন্দে নিরানন্দ আসে না
কলম২৪ প্রতিবেদক
আবহমানকাল হতে বাঙালি সমাজে বাঙালির জীবনাচার হতে প্রসূত অসংখ্য ছন্দবদ্ধ নান্দনিক প্রবাদ বা প্রবচন ' এর প্রচলন আছে। এমনই এক জনপ্রিয় প্রবচন 'নেই কাজ তো খই ভাজ'। প্রবচনটি ব্যক্তি ও পরিবারের গন্ডি পেরিয়ে কখনো-কখনো সামাজিক, রাজনৈতিক এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্মক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। সম্প্রতি মঙ্গল শোভাযাত্রা কে ঘিরে ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর মধ্যে এমনই প্রবচনীয় প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যদিও তাদের এ হেন প্রবণতা নতুন নয়। তবে তাদের এই প্রবণতা স্রেফ ঐ প্রবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে বাঙালি জাতিসত্তা ও বাঙালি সংস্কৃতি বিরোধী দীর্ঘকালের এক অন্ধকার চেতনা। তাদের এই বিরুদ্ধ চেতনা ধর্মান্ধতার মোড়কের ওপর আবার রাজনৈতিক মোড়কেও এখন বেশ সুসংহত।
প্রসঙ্গত,বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় এবং একমাত্র অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন উৎসব হলো পহেলা বৈশাখ। সংক্ষেপে, মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে এটি 'ফসলি সন' হিসেবে সূচিত হলেও পরবর্তীতে বঙ্গীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী তা 'বাংলা নববর্ষ' হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। হাজারো বছরের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সংস্কৃতির সংমিশ্রণে দিবসটি আড়ন্বরপূর্ণ হয়ে সময়ের আবর্তে তা বর্তমানে বাঙালির সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বলাবাহুল্য, তদানীন্তন পশ্চিমপাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক স্বৈরশাসক কর্তৃক বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা নির্মূলের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কবিগুরুর গান, কবিতা প্রভৃতি শিল্পসৃষ্টি প্রচারে ও চর্চায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরই প্রতিবাদে ১৯৬৫ সালে (১৩৭৫ বঙ্গাব্দ) ছায়ানট রমনা বটমূলে কবি গুরুর হৃদয় স্পর্শী গান- 'এসো হে বৈশাখ... এসো, এসো... ' পরিবেশনার মাধ্যমে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা করে। এভাবেই শুরু হয় পহেলা বৈশাখে বাংলা বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিক উৎসব। সেখান থেকে পহেলা বৈশাখ শুধু 'বাংলা নববর্ষ'ই নয়, উপড়ন্ত দিবসটি বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। পরিণত হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসবে। লক্ষ্যণীয়, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও বাঙালি সংস্কৃতির উপর আঘাত থেমে থাকেনি। এরই ধারাবাহিকতায় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালি সংস্কৃতির বিকৃত বয়ানের মাধ্যমে বৈশাখী উৎসবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ পাঁচদশক ব্যাপী অপপ্রচারণা চালানো হয়। উদ্দেশ্য, বাঙালি সংস্কৃতিতে নিরুৎসাহ সৃষ্টির মাধ্যমে সংস্কৃতি বিমুখ একটি সাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে চেষ্টা চলে গ্রামের সরলমনা ধর্মভিরু জনগোষ্ঠীকে মোটিভেট করা। এতে তারা অনেকটাই সফল হয়। এতে ইতোমধ্যে এমনকি শহরের সিভিল সোসাইটিও অনেকটা মোটিভেটেড হয়ে পড়েছে! কেননা তাদের এই সংস্কৃতি বিরোধী অপতৎপরতা এখন রীতিমতো রাজনৈতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে যা জাতির জন্য গভীর হতাশার বটে!
উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বাংলা নববর্ষ বরণের এই লোকজ উৎসব 'আনন্দ শোভাযাত্রা' নামে চালু করে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে সংঘটিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে 'অশুভের বিতাড়ন ও শুভের আগমন'-এই ভাবধারায় তা 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' নামে অভিহিত হয়। পর্যায়ক্রমে মঙ্গল শোভাযাত্রার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে।ফলে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সমাদৃত হয়ে ওঠে হাজারো বছরের বাঙালি সংস্কৃতিমন্ডিত এই লোকজ ঐতিহ্য। এমতাবস্থায়, ২০১৬ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো 'মঙ্গল শোভাযাত্রা' কে 'ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ' বা 'অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য' হিসাবে স্বীকৃতি দান ও নথিভুক্ত করে। এতে করে বাঙালি জাতি ও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বের দরবারে আনুষ্ঠানিকভাবে মর্যাদাশীল হয়ে ওঠে। বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পরে বাঙালি জাতির জন্য দ্বিতীয় গৌরবের বিষয়টি হলো- এই স্বীকৃতি। এখানে লক্ষণীয়, শোভাযাত্রাকে শুধু 'আনন্দ'এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ করার লক্ষ্যে পরবর্তীতে 'মঙ্গল' নামকরণ করা হয়। মানবীয় মনস্তত্ত্বে 'শুভ' বা 'কল্যাণ'মূলক ইতিবাচক ভাবদর্শন চর্চা ও আত্নস্থ করার উদ্দেশ্যেই এখানে 'মঙ্গল' এর অবতারণা। আমরা জানি, সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত 'মঙ্গল' এর আভিধানিক অর্থ 'শুভ' বা 'কল্যাণ'। এর ভাবার্থ হলো- 'শান্তি'। মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই শান্তি প্রত্যাশী। দিনশেষে সে শান্তির সোপানেই আরোহন করতে চায়। এটাই মানুষের স্বভাবজাত ও চিরন্তন প্রবণতা। সুতরাং, শোভাযাত্রায় 'মঙ্গল' এর সংযোজন ছিল একটি সৃজনশীল চিন্তার পরিমার্জিত সংস্করণ বৈকি। অর্থাৎ, এখানে 'মঙ্গল' কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে প্রমোট করে না। বস্তুত এটি সর্বজনীন হিতৈষী মনোভাবকেই উৎসাহিত করে।
কিন্তু অতীব দুঃখের সাথে আমরা লক্ষ্য করলাম যে, ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িক গোষ্ঠী 'মঙ্গল' এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক (হিন্দুয়ানি) রং লাগিয়ে শুরুতেই শোভাযাত্রা থেকে তা বাতিলের জন্য বিভিন্ন ধরনের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। অবশেষে '২৪ অভ্যুত্থান পরবর্তী তারা সফল হয় এবং ২০২৫ সালে চারুকলার এই শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। নতুন নামকরণ হয় ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। বলা যায় অন্তর্বর্তী সরকারের দেড়বছর ছিল তাদের জন্য স্বর্ণযুগ। এমতাবস্থায় বর্তমান সরকারও 'শ্যাম রাখি না কুল রাখি' ভাবতে গিয়ে অবশেষে উভয় কুল রক্ষা করে 'আনন্দ' ও 'মঙ্গল' দু'টোই বাদ দিয়ে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা' নামকরণ করেছেন। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে এভাবে একের পর এক নতজানু পরিস্থিতিতে অবশেষে 'বৈশাখী শোভাযাত্রা'ও থাকে কিনা এমনকি, পরিশেষে বর্ষবরণ উৎসবটাই চিরতরে বাতিল হয়ে যায় কিনা তা নিয়ে সচেতন মহলে গভীর সন্দেহ জেগেছে। পরিবর্তিত নামের ক্ষেত্রে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিরইবা কি হবে তা ভাবিয়ে তুলেছে। শুধু তাই-ই নয়, এরকম ঠেলাঠেলিতে আত্মমর্যাদাশীল সাংস্কৃতিক জাতি হিসেবে অর্জিত কৃতিত্ব ধরে রাখা আর সম্ভব হবে কিনা সেটাই এখন সন্দেহের বিষয়। এভাবে যদি একের পর এক ভাষা সংস্কৃতির ওপর নির্বিঘ্নে আঘাত আসতে থাকে তবে তা অদুর ভবিষ্যতে বিপন্ন হতে পারে মর্মে সচেতন মহল আশঙ্কিত হয়ে পড়েছে। ইতোপূর্বে জাতীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী ও প্রথিতযশা দুই বাতিঘর 'উদীচী' ও 'ছায়ানট' এ বিভৎসকর হামলা এবং বাউলদের ওপর একের পর এক নির্যাতন বিপন্নতার সেই আশঙ্কাই প্রকাশ করে। ইতোমধ্যে, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন, প্রচারণা, অনুমতি প্রদান ও এতে সরকারি অর্থায়ন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট পর্যন্তও দায়ের করা হয়েছে।
পরীলক্ষণীয়, বিশ্বায়নের আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে অন্যরা যখন প্রতিনিয়ত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা ভাষা ও শব্দের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার দুর্গন্ধ খুঁজে বেড়াচ্ছি। এভাবে অপাংক্তে অপচয় করছি মেধা ও মনন। ফলে, অগ্রসরের পরিবর্তে আমরা প্রতিনিয়তই পশ্চাৎপদ হচ্ছি যা গভীর হতাশার বটে!
আমাদের মনের রাখা দরকার, সংস্কৃতি সভ্যতার জন্ম দেয়। সংস্কৃতি হলো জাতির পরিচায়ক। আবার, সংস্কৃতি হলো- মনুষ্যত্বের সেফগার্ড। এটা মানুষের সুকুমারবৃত্তি প্রকাশের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মাধ্যমও বটে। সর্বোপরি, সংস্কৃতি হলো- স্রষ্টার এক অপার বিশেষায়িত সৃষ্টি। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত: 'আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয় এতে রয়েছে নিদর্শন জ্ঞানবানদের জন্য।'-[ সূরা:রূম ; আয়াত -২২]। লক্ষ্যনীয়, ঘোষিত মহাবাণীতে সংস্কৃতির তিন মৌল উপাদান- প্রকৃতি, ভাষা ও বর্ণ(জাতি) প্রতিভাত হয়েছে যা প্রকারন্তরে সংস্কৃতিকেই উচ্চ মর্যাদাশীল করেছে। অর্থাৎ, প্রতিটি জাতির জন্য তার নিজস্ব সংস্কৃতি ঐশ্বরিক ভাবেই নির্ধারিত। এটা সংশ্লিষ্ট জাতির পবিত্র আমানত বটে। তাই স্বজাতির সংস্কৃতিকে হেফাজত করা সংশ্লিষ্ট জাতির ক্ষেত্রে একটি পবিত্র দায়িত্ব। সুতরাং, ধর্মের বিকৃত ধোঁয়া দিয়ে স্বজাতীয় সংস্কৃতিতে আঘাত হানা প্রকারন্তরে ধর্মের মাহাত্ম্যে আঘাতের শামিল'- আমাদের সকলকেই এটা মাথায় রাখা উচিৎ।
কাজী মাসুদুর রহমান
কলামিষ্ট ও গবেষক

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান
ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com