১ মে ২০২৬
preview
মহান মে'র চেতনা ও শ্রমিকের বেদনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

মহান 'মে দিবস' সভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য চেতনার দিন। সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় এটা এমনই এক বৈপ্লবিক(revolutionary) দিন যেদিন শ্রমিক তার বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে বস্তুত শোষিত মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারকেই জাগ্রত করেছিল। সেই সূত্রে মহান মে দিবসকে শুধু আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসই নয়, উপরন্তু শোষিত নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দিবস হিসেবে গণ্য করলেও তা অত্যুক্তি হবে না।


সংক্ষেপে ইতিহাসের পাতা থেকে' - ১৯'শ শতাব্দীর পূর্বে আমেরিকায় অবস্থিত শ্রমিকদের সপ্তাহের ছয় দিনে দৈনিক ১০ থেকে ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। তখন তাদের মজুরিও ছিল যৎসামান্য।তার ওপর আবার ছিল না জীবনের নিরাপত্তা। তখন শ্রমিকদের খুবই মানবেতর জীবন যাপন করতে হতো। পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা নিপীড়িত শোষিত শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চাপা কষ্টের ক্ষোভ সঞ্চিত হতে হতে এক সময় তা অধিকার আদায়ের নিমিত্তে প্রবল বিদ্রোহের রূপ নেয়। এক পর্যায়ে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে পড়লে এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৬ সালের ১ লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে প্রায় ৫ লক্ষ বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের উপস্থিতিতে ৮ ঘন্টা কাজসহ আনুষঙ্গিক নিরাপত্তার দাবিতে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহী সমাবেশ সংঘটিত হয়। এতে শাসক ও শ্রমিকদের মধ্যে দাঙ্গা সংঘটিত হলে তখন শাসকের বুলেটে ১১ জন শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু ঘটে ও বহু শ্রমিক রক্তাক্ত হয়। অবশেষে লাশ ও রক্তের বিনিময়ে দাবি আদায় হয়। ইতোমধ্যে বিদ্রোহের উষ্ণ প্রভাব পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পরার ফলে সেখানেও ৮ ঘন্টা শ্রম নিশ্চিত হয়।


পরবর্তীতে ১৮৯০ সালের ১৪ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিষ্ট কংগ্রেসের সমাবেশ থেকে ১লা মে দিনটিকে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরে,  শ্রমজীবী মানুষের সেই বীরোচিত বিসর্জনের স্মরণে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি বছরের ১লা মে  'মে দিবস' বা 'আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস' হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে পৃথিবীর ৮০ টি দেশ এক যোগে রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি পালন করে থাকে। বর্তমানে ৮ ঘন্টা কর্মসহ শ্রমিকের আনুষঙ্গিক মৌলিক অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে পরিণত হয়েছে যা প্রতিটি স্বীকৃত রাষ্ট্রকে অনুসরণ করার প্রবিধান রয়েছে।


উল্লেখ্য , এরপরও বিশ্বব্যাপী শ্রমিকের অধিকার উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের অধিকারে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে এসেছে মর্মে জানিয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠনগুলোর জোট 'ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন' বা 'ITUC'। গ্লোবাল রাইটস ইনডেক্স–২০২৫ এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পৃথিবীর সব মহাদেশেই শ্রমিক অধিকার চরম হুমকির মুখে পরেছে।প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রমিক অধিকারের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে—বাংলাদেশ, বেলারুশ, ইকুয়েডর, মিসর, সোয়াজিল্যান্ড, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, তিউনিসিয়া ও তুরস্ক। এতে আবার পিছিয়ে নেই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধনী দেশ-আমেরিকা। 'আইটিইউসি'এর রিপোর্ট অনুযায়ী গণতন্ত্র,  মানবাধিকার ও  শ্রমিক অধিকারের ছবকদাতা ও ফেরীওয়ালা এই দেশটির (আমেরিকা) বিরুদ্ধে গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে।


প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের সম্মিলিত অধিকার ধ্বংসে ট্রাম্প প্রশাসন রীতিমতো বুলডোজার চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে, ট্রাম্প প্রশাসন শ্রমিক অধিকার পরিপন্থি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—পরিবহণ নিরাপত্তা প্রশাসনের ৪৭ হাজার কর্মীর ইউনিয়ন সুরক্ষা বাতিল, ফেডারেল কর্মীদের একটি বড় অংশের নাগরিক সেবা সুরক্ষা প্রত্যাহারের চেষ্টা ও জাতীয় শ্রমিক সম্পর্ক বোর্ডের একজন সদস্যকে বরখাস্ত করা, যাতে বোর্ডে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সদস্য না থাকে। ট্রায়াঙ্গেল আরো বলেন যে, অনেক দেশে দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতারা ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্রবিরোধী আচরণ করছেন। তাদের প্রথম লক্ষই হচ্ছে শ্রমিকদের অধিকার দমন করা। কারণ শ্রমিকরাই সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক শক্তি। এ কারণে আমরাই তাদের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দেশে ডানপন্থি রাজনীতিবিদ ও তাদের ধনকুবের মিত্ররা শ্রমিকদের অধিকার হরণ করছেন। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক, আর্জেন্টিনায় হাভিয়ের মিলেই ও এদুয়ার্দো ইউরনেকিয়ানের মতো ব্যক্তিদের নাম বিস্ময়কর ভাবে উঠে এসেছে! এরা এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী ও বৈষম্যমূলক আচরণে লিপ্ত মর্মে প্রতিবেদনে অপ্রত্যাশিত সত্য চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি মহাদেশে শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে। এর মধ্যে আমেরিকা ও ইউরোপের পরিস্থিতি ২০১৪ সালে সূচক চালুর পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৫১টি দেশের মধ্যে মাত্র ৭টি দেশ শ্রমিক অধিকার সূচকে শীর্ষ রেটিং পেয়েছে। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৮টি।


প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, ৭২ শতাংশ দেশে শ্রমিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত, যা সূচক চালুর পর থেকে সবচেয়ে খারাপ রেকর্ড। এ ছাড়া, ৮৭ শতাংশ দেশে ধর্মঘটের অধিকার ও ৮০ শতাংশ দেশে সম্মিলিত দর-কষাকষির অধিকারও লঙ্ঘন করা হয়েছে। আইটিইউসির মহাসচিব লুস ট্রায়াঙ্গেল এর ২০২৫ সালের তথ্য প্রতিবেদনে শ্রমিক অধিকারের এই ভয়ার্ত চিত্র ফুটে উঠেছে।


উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী শ্রম শোষণের নিষ্ঠুরতা থেকে বাদ যায়নি শিশুরাও। আইনসঙ্গত ভাবে বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও এর বাস্তব চিত্র বেশ আঁতকে ওঠার মতো। ২০২৫ সালের ১২ জুন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা- 'আইএলও' এবং ইউনিসেফের এক যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রচেষ্টার ফলে শিশুশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও ২০২৪ সালে শিশুশ্রমে যুক্ত ছিল প্রায় ১৩ কোটি ৮০  লাখ শিশু। এর মধ্যে ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত, যা তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের চিত্র সুখকর নয়। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩৫ লাখ শিশুশ্রমিক দেশে বিদ্যমান আছে যার মধ্যে ১০ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। তবে দেশের শ্রমখাত উন্নয়নের লক্ষ্যে গেল অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ১০ সদস্য বিশিষ্ট শ্রম সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এতে প্রস্তাবিত ২৫ টি সুপারিশের মধ্যে মাত্র ৩টি বাস্তবায়ন করা হয়।


এই হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রমিকের হালের জীর্ণ চিত্র। আমরা আধুনিক সভ্যতার বড়াই করলেও সভ্যতার মুখোশের আড়ালে আজো 'প্রভুত্ব-দাসত্ব' মূলক শোষণ প্রবণতা আমাদের পুঁজিবাদী মনস্তত্ত্বে বেশ গ্রথিত যা শ্রমিকের উল্লেখিত বিরাজমান দৈন্যচিত্রের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট ভাবে ফুটে ওঠে! আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, বিশ্ব সভ্যতার এই ঝকঝকে চকচকে পরিকাঠামোর নেপথ্যে রয়েছে যুগপরম্পরা নিযুক্ত অসংখ্য শ্রমিকের রক্ত, ঘাম ও দীর্ঘশ্বাসের সংমিশ্রণ। যতদিন শ্রমিকশ্রেণী কে দাসত্বের পেষণ থেকে মুক্তি দিয়ে শোষণহীন মানবিকতায় উপলব্ধি না করা যাবে ততদিন বিদ্যমান সভ্যতা প্রকৃত অর্থেই 'মনুষ্য সভ্যতা' হয়ে উঠবে না।


কাজী মাসুদুর রহমান

লেখক-কলামিস্ট




















  


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান

ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com