৭ মে ২০২৬
preview
এই মৃত্যুর মিছিলের দায় কার?

কাজী মাসুদুর রহমান

সম্প্রতি দেশে হাম যেন প্রায় মহামারী আকার ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গেল ৬ জুলাই অবধি হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২৪ জনে। এর মধ্যে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৫৬ জন ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ২৬৮ জন।


এর বাইরে গেল ৬ জুলাই অবধি হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ৯৯ জনে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা ৪৪,২,৬০ জন। বিরাজমান পরিস্থিতিতে মৃত্যুর অজানা সংখ্যা যে কতবেশীতে দাড়াবে তা আঁচ করা মুশকিল! অর্থাৎ, হামের সার্বিক পরিস্থিতি বেশ আতঙ্কের পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।


গবেষণার তথ্য মতে, এটি করোনার চেয়েও দ্রুত সংক্রমণশীল। এটি দ্রুত সংক্রমণশীল শক্তিশালী ভাইরাস জনিত রোগ। এটি বাতাস ও আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ও মুখের ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। ইতোমধ্যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) বাংলাদেশে চলমান হাম পরিস্থিতিকে 'উচ্চ ঝুকপূর্ণ' ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। টিকার তীব্র ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান মৃত্যু নিয়ে সংস্থাটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমতাবস্থায় জনমনে ব্যাপক আতংক ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।  বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির নেপথ্যে টিকাদানের ঘাটতিকেই বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।


সংস্থাটি জানিয়েছে, অতীতে বাংলাদেশ হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে দুর্বলতা এবং ২০২০ সালের পর বড় আকারের টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালিত না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু হামের ঝুঁকিতে পড়েছে। এ কারণেই দেশে আবার বড় আকারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম 'প্রথম আলো'র সাথে এক মতবিনিময় কালে টিকাদান কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ ও সফল সহযোগী জাতিসংঘের ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া জানিয়েছেন যে, ইউনিসেফ একাধিকবার বাংলাদেশের গত অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।


সম্প্রতি এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকার দেশে টিকা আনতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং তারা টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিও পরিবর্তন করেছিল।’ এই তথ্যের সূত্রে স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া হামের এ হেন প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তা রীতিমতো গা শিউরে ওঠার মতো!


তিনি বলেন, 'বিশ্বব্যাপী টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউনিসেফ শতাধিক দেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করে। বাংলাদেশ সরকার-ইউনিসেফের একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হয়ে আসছে, যার ফলে সময়মতো, সাশ্রয়ী এবং সমতাভিত্তিকভাবে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।


২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।


দুঃখজনকভাবে, এ সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বজায় রাখা সম্ভব হয়।


তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কারণ, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করা যায়নি এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করতে পারেনি।"


তিনি আরো বলেন, " ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনিসেফ ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মার্চ মাসে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বাতিলের নির্দেশ দেন। এরপর এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।" নতুন সরকারের এ হেন দূরদর্শী গণহিতৈষী উদ্যোগ বিরাজমান চরম আতঙ্কের অন্ধকারে অনেকটা আশার আলো জাগিয়েছে।


অর্থাৎ, স্পষ্টত:ই প্রতীয়মান হয় যে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিদ্যমান সংকটের দায় কোনক্রমেই এড়াতে পারেন না। কেননা, তাদের অবহেলা ও অদূরদর্শিতার কারণে এতগুলো নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ অবলীলায় ঝরে গেছে। মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে আরো শত শত শিশুর প্রাণ। এটাকে একপ্রকার পরোক্ষ গণহত্যা বললেও অত্যুক্তি  হবে না। ভবিষ্যতে কেউ যেন নিষ্পাপ শিশুদের অমূল্য প্রাণ নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলতে না পারে সেজন্য জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির আওতায় আনার লক্ষে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন 'বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন' গঠন করা এখন সময়ের দাবি বলে সচেতন মহল মনে করে। এতে সকল মৃত শিশুদের নিষ্পাপ আত্মা কিছুটা হলেও হয়তো শান্তি পেতে পারে।


লেখক, কলামিস্ট


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান

ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com