১৬ মে ২০২৬
preview
হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর দায়ে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচারের দাবিতে ফুঁসে উঠছে দেশের সব পেশার মানুষ। প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামছে সচেতন সমাজ।


আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘প্রতিরোধযোগ্য হাম রোগে নিষ্পাপ সম্ভাবনাময় শিশু হত্যার জন্য দায়ী ইউনূস-নূরজাহান গংদের বিচার ও মৃত শিশুদের ক্ষতিপূরণের দাবি’ এবং জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।


‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এই প্রতিবাদে অংশ নেন শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ সময় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো মৃত শিশুদের প্রতিকৃতি নিয়ে প্রতিবাদ জানান সাধারণ মানুষ।


মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, জনস্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা আজ ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে।


মানববন্ধনে অংশ নিয়ে বক্তারা বলেন, ড. ইউনূস সরকারের গাফিলতিতে আজ হাজারো শিশু মৃত্যুর মুখে। ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে ৫ শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যার বলি হয়েছে সাধারণ পরিবারের নিষ্পাপ শিশুরা। এজন্য ইউনূস সরকারের সংশ্লিষ্টদের বিচার করতে হবে।


এছাড়া দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি করে দেশের স্থায়ী ক্ষতি করা হয়েছে। এই চুক্তি অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানান বক্তারা। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা নিরসন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই বিশাল মানববন্ধন থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। মানববন্ধনে উপস্থিত সাধারণ মানুষও এসব দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।


কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে টিকা সংকটে মৃত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ক্রিয়েটিভ রাইটার্স-এর মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালির সঞ্চালনায় মানববন্ধনের মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র পরিচালক, কলাম লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট এস এম কামরুজ্জামান সাগর।


পরে উপস্থিত বক্তারা একে একে বক্তব্য দেন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।


মানববন্ধনে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী সাকিল আহমদ অরণ্য বলেন, “সরকারি গাফিলতির কারণে অকালে চলে গেছে শত শত শিশু। গত কয়েক সপ্তাহের পরিসংখ্যান আমাদের ব্যথিত করেছে। আজকে আমরা এখানে শুধু কান্না করতে আসিনি; আমরা এসেছি বিচার দাবি করতে। ৫ শতাধিক শিশুর মৃত্যু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি পরিকল্পিত এক মানবিক বিপর্যয়। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে পরিচালিত কার্যকর টিকা ব্যবস্থা বাতিল করে ভ্যাকসিন ক্রয়নীতি হঠাৎ পরিবর্তন করা হয়।"


তিনি বলেন, "এই নীতিপরিবর্তনের পেছনে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম। আমরা জানতে পেরেছি, ইউনিসেফ বারবার নূরজাহান বেগমকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়। প্রশ্ন রাখছি, ড. ইউনূস সাহেব, যিনি সারা বিশ্বে পুরস্কার পেয়েছেন, তিনি কীভাবে দেশের শিশুদের রক্তের দায় এড়িয়ে চলতে পারেন? বিচারহীন এই সংস্কৃতি আর নয়।”


মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে সাকিল আহমদ বলেন, একদিকে হামে শিশু মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি হুমকির মুখে ফেলে একটি ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে, যা আসলে এক ধরনের অর্থনৈতিক আত্মসমর্পণ। এই চুক্তি অনুযায়ী সয়াবিন, ভুট্টা এবং মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করতে বাধ্য হবে, যা দেশের কৃষকদের ধ্বংসের মুখে ফেলবে।


তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অসম চুক্তি দেশের কৃষি ও স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।


অ্যাডভোকেট চৈতালি চক্রবর্তী বলেন, “আমি চাই ইউনূস, তার সহযোগী নূরজাহান এবং তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। তারা দেশটাকে লুট করেছেন। তারা যেন কোনোভাবেই দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন।” তিনি আরও বলেন, জনগণের ট্যাক্সের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খায়ের উদ্দিন শিকদার বলেন, ড. ইউনূস পরিকল্পিতভাবে (মেটিকুলাস ডিজাইনে) ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশটাকে নতুন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছেন। বাঙালি বুঝতে পেরেছে, ইউনূসের কারণে দেশের সার্বভৌমত্ব আজ হুমকির মুখে। সাংবাদিক হাসান আহমেদ সংহতি প্রকাশ করে অবিলম্বে হামের জবাবদিহি ও মার্কিন ঔপনিবেশিক চুক্তি বাতিলের দাবি জানান।


মানববন্ধন থেকে উত্থাপিত ১০ দফা দাবি:


১. টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও হামে শিশু মৃত্যুর জন্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা।


২. জনস্বার্থবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করা।


৩. জুলাই ২০২৪-এর কোটা আন্দোলনের হত্যাকাণ্ডের জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার।


৪. অগ্নিসন্ত্রাস, ভাঙচুর, লুটপাট ও মব কালচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা।


৫. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আটক সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি।


৬. সকল রাজনৈতিক দলের অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করা।


৭. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ বন্ধ করা।


৮. তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রত্যাহার।


৯. আইসিটি আদালতে রাজনৈতিক হয়রানি ও প্রহসনমূলক বিচার বন্ধ করা।


১০. সকল শিক্ষার্থীর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা।


সমাপনী বার্তায় বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি অনতিবিলম্বে এই ১০ দফা দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামীতে সারাদেশে আরও কঠোর ও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিবাদী মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।


মিছিলে ‘আমার শিশু মরল কেন, ইউনূস তুই জবাব দে’, ‘মার্কিন গোলামি চুক্তি বাতিল করো, করতে হবে’—এমন বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে বিচার দাবি করা হয়। প্রতিবাদকারীরা বলেন, জনগণের জীবন, স্বাস্থ্য ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান

ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com