১৬ মে ২০২৬
preview
শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকার বন্ধ হোক

কাজী মাসুদুর রহমান

সম্প্রতি মাদ্রাসা গুলোতে (সব নয়) শিশু ধর্ষণ ও বলাৎকার আশঙ্কা জনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মভিত্তিক এ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এই জাতীয় চরম গর্হিত অপরাধের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা গুলোতে শিশুরা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মর্মে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ প্রচলিত আছে।


তবে কতগুলো মাদ্রাসা গুলোতে কতজন শিশু এ জাতীয় নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তার বাৎসরিক পরিসংখ্যানের নিয়মিত হিসাব রাখা জরুরী বলে সচেতন মহল মনে করেন। যদিও এ জাতীয় উদ্যোগ নিতে তেমন কোনো সংস্থা বা গোষ্ঠী কে দেখা যায় না। ফলে, এ হেন পৈশাচিক ঘটনা সমূহ অনেকটাই অন্তরালে থেকে যায়। ঘটনাক্রমে প্রকাশ পায় মাত্র কিছু।


নির্যাতিত শিশুদের অধিকাংশেরই পরিবার লোক লজ্জার ভয়ে চেপে যান। ক্ষতিগ্রস্ত অনেককেই আবার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ কিংবা দোষী ব্যক্তির দ্বারা 'ধর্মীয় গোপনীয়তা রক্ষা' এর নামে ধর্মীয় জুজুর ভয় দেখানো হয়। সংঘটিত পৈশাচিক ঘটনাবলী এভাবে ধামাচাপা দিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের বাধ্য করানো হয়। তবে ধর্ষিত শিশু বা নারীর জীবন যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে তখন কোনো না কোনো ভাবে ঘটনা প্রকাশ পায়। তখন নড়েচড়ে বসে মিডিয়া ও প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এহেন কুকর্ম যেন রীতিমত একটি ঘৃণ্য গুপ্তসংস্কৃতির রূপ নিয়েছে।


বলাবাহুল্য, ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের  দুর্বলতা শ্বাশ্বত। বিশেষ করে প্রান্তিক স্তরের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় দুর্বলতা অন্যদের চেয়ে তুলনামূলক বেশিই থাকে। সেই দুর্বলতা থেকেই তারা সাধারণত মাদ্রাসা শিক্ষায় ঝোঁকে। অপরাধীরা ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে ফাঁদ এটে সেই দুর্বলতাকে তাদের পৈশাচিক রিপু চরিতার্থের কাজে লাগায়। বিস্মিত বিষয় হলো, এ হেন পশুবৃত্তিক গর্হিত অপরাধের বিরুদ্ধে কথিত আলেম সমাজকে সোচ্চারিত হতে দেখা যায় না; তৎপর হতে দেখা যায় না ধর্মের আলোকিত শিক্ষার আলোকে এ সকল পৈশাচিক কুকর্মের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে। অথচ, বিপরীতে এদের(কথিত আলেম) অনেককেই নারী বিদ্বেষী ফতোয়া দিতে ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াতে বেশ উচ্চকণ্ঠী হতে দেখা যায়। মনগড়া ফতোয়ায় এদের অনেকেই আবার যে কাউকে যখন তখন কাফির, মুশরিক, মুরতাদ,মোনাফিক, বিধর্মী, জাহান্নামি প্রভৃতি নেতিবাচক সনদ দিতেও দ্বিধা বোধ করেন না। ধর্মীয় কোন ইস্যুতে পান থেকে চুন খসলেই তথাকথিত অতি ধার্মিকতার ভাবাবেগে তাদের অনেকেই আবার দ্বিধা করেন না জনপথ ও জনপদ অশান্ত করে জনদূর্ভোগ সৃষ্টিতেও। পাশাপাশি কোন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকেও এমন পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা যায় না। এমনকি নারীবাদী ও প্রগতিশীল গোষ্ঠীদেরকেও তেমনটা প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না।


ফলে, এসকল (একশ্রেণীর) লেবাসী পিশাচদের দ্বারা অবলীলায় নীরবে-নিভৃতে যৌন ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে সমাজের অসহায় নারী ও শিশু।


উল্লেখ্য, মাদ্রাসা শিক্ষার আড়ালে এ সকল অপরাধীদের পৈশাচিক কর্মকান্ডের সমালোচনা কিংবা প্রতিবাদ করলেই তাদের(অপরাধী) সমর্থনে একশ্রেণীর ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদীরা 'মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে' মর্মে উপস্থাপন করে তাদের কুকর্মগুলো কে আড়াল করার অপকৌশল চালায় এবং এভাবে একপ্রকার বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এমনকি এসকল অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াকে 'ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র' হিসেবে আখ্যায়িত করে 'নাস্তিক' ট্যাগ দিয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে সমালোচনাকারী বা প্রতিবাদকারী কে মবের কোপানলে ফেলার  অপচেষ্টাও চালানো হয়। এভাবে তারা পরিস্থিতি ঘোলাটে করে মূলতঃ অপরাধীদের অপকর্মসমূহ আড়াল করে নিরাপত্তা দেয়।


সম্প্রতি নেত্রকোনায় একজন মাদ্রাসার পরিচালক ১১ বছরের একটি শিশুকে একাধিকবার ধর্ষণ করেন মর্মে অভিযোগ ওঠে। ইতোমধ্যে শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন ঘটলে তাকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা: সায়মা শিশুটির পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে নিশ্চিত করেন যে শিশুটি সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পরবর্তীতে এই চিকিৎসক সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনাটি তুলে ধরলে তা মিডিয়াসহ সাধারণ মানুষের নজরে আসে। এরপরই প্রশাসন অভিযুক্ত ব্যক্তি কে গ্রেফতার করে। এই কারণে পরবর্তীতে তিনি ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীর দ্বারা ব্যাপক সাইবার বুলিং এর শিকার হন। এমনকি তিনি ও তার পরিবার হত্যার হুমকিরও শিকার হন মর্মে বিষয়টি তিনি প্রশাসনের নজরে আনেন। অবশ্য হুমকিদাতাদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এটা খুবই স্পষ্ট যে, ঐ চিকিৎসক কে হুমকি দানের মাধ্যমে কার্যত সমাজে একটি ভয়ার্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে এ জাতীয় ঘটনা ঘটলেও তা যেন প্রকাশ না পায়। অর্থাৎ, ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে এ জাতীয় পৈশাচিক ঘটনা ঘটলে তা যেন সবসময় ধামাচাপাতেই থাকে।


উল্লেখ্য, ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে এ জাতীয় নরপশুরা কখনোই ধর্মের লোক হতে পারে না। এদেরকে যারা সরাসরি অথবা নীরবতার মাধ্যমে সমর্থন করে তারাও প্রকৃতপক্ষে ধর্মের লোক হতে পারে না। এ জাতীয় নরপিশাচরা শুধু মানুষ ও সভ্যতারই শত্রু নয় উপড়ন্ত ধর্মেরও শত্রু বটে। এদের কুকর্মের দ্বারা নষ্ট হয় ধর্মের পবিত্রতা। ভূলুণ্ঠিত হয় ধর্মের মাহাত্ম্য। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত -"তোমরা ব্যাভিচারের কাছেও যেওনা; নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ"[সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত-৩২]। মহান আল্লাহ আরো বলেন- "অশ্লীলতার কাছেও যেওনা তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক" [সুরা আনআম, আয়াত-১৫১]। এভাবেই পবিত্র ইসলাম মানবজাতির মাঝে মানুষের প্রকাশ্য ও গোপন কর্মগুলোকে সুসভ্য ও পরিমার্জন করার তাগিদ দিয়েছেন যাতে একটি পরিশীলিত সমাজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষ শান্তি প্রাপ্ত হয়।


উল্লেখ্য, সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রেও মাঝে মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও তার অধিকাংশই প্রকাশ পায়। সেখানে ধর্মীয় শিক্ষালয়ের(সব নয়) মতো এতোটা গুপ্ত থাকেনা । ধর্ষণ ও বলাৎকার গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে যেভাবেই ঘটুকনা কেন তা কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। এ জাতীয় পশুসুলভ নরপিশাচরা সর্বৈব পরিত্যাজ্য। তবে, বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে এ জাতীয় পশুত্বের চর্চা কখনই মেনে নেয়া যায় না। কেননা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলো হলো মানুষের সর্বোচ্চ ও সর্বশেষ আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা। সাধারণ মানুষ ধর্মের প্রতি সবসময়ই সরলপ্রাণ ও সরলমনা থাকে। ফলে, একজন অপরাধী যদি ধর্মীয় লেবাসে থাকে তবুও সাধারণ ধর্মপ্রাণমানুষ সরলতার দৃষ্টিকোণ থেকে তাকে একজন ধার্মিক মর্মে বিশ্বাস করেন। সমাজের অন্য মানুষের চেয়ে তাকে অপেক্ষাকৃত বিশেষ ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন বা ভাবেন। এ সকল অপরাধীরা ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে সেই সরলতারই সুযোগ নেয়। তাই এ ধরনের ধুরন্ধর অপরাধীরা কখনই ক্ষমার যোগ্য নয় এবং তাদের শাস্তিও বিশেষ দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত যাতে তারা এমন পশুবৃত্তিক প্রবণতা থেকে নিবৃত থাকে । বিরাজমান পরিস্থিতি যেন এক অঘোষিত সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। তাই এই সংকট নিরসনে প্রবল ভাবে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এমনকি রাজনৈতিকভাবেও এই সংকটকে মোকাবেলা করতে হবে। সমাজ ও সভ্যতার মর্যাদা রক্ষার দায় সকলেরই। এক্ষেত্রে দুরবস্থা উত্তরণে দলমত নির্বিশেষে সকলকে এক প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে, বিদ্যমান নৈতিক অবক্ষয় রোধে নীরবতা ভেঙে সম্মানিত আলেম সমাজকেই বেশী এগিয়ে আসতে হবে। কেননা , ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার দায় সবচেয়ে বেশি তাদেরই।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান

ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com