১৭ মে ২০২৬
preview
হামে শিশুমৃত্যু: ভঙ্গুর টিকাদান কাঠামো ও স্বাস্থ্য বৈষম্যের দায় কার?

সুমিত বণিক

বাংলাদেশে চলমান হাম-রুবেলা পরিস্থিতি শুধু একটি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা, টিকাদান কাঠামোর ভঙ্গুরতা এবং স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।


সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যম ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে ছাড়িয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে শিশুদের দীর্ঘ সারি, আইসিইউ সংকট এবং উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের অসহায় মুখ—সবকিছু মিলে এটি এখন এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। 


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে (১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল) দেশে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হাম রোগী মিলেছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় প্রায় তিন হাজার জনের শরীরে হামের উপস্থিতি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আক্রান্তদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—মারা যাওয়া অধিকাংশ শিশুই টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশু। 


বাংলাদেশ একসময় দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচির সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৪-১৫ সালের জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনে পাঁচ কোটির বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। ফলে শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই ধারাবাহিকতায় বিপর্যয় ঘটেছে। কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়ে, অনেক এলাকায় এমআর ক্যাম্পেইন বিলম্বিত হয়, আবার কোথাও টিকার ঘাটতি দেখা দেয়। ডব্লিউএইচও ও বিভিন্ন গবেষণা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এমআর-২ কভারেজ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে বিপুল সংখ্যক শিশু “ইমিউনিটি গ্যাপ”-এর মধ্যে পড়ে। 


জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল ভাইরাসের কারণে নয়; বরং এটি একটি “সিস্টেম ফেলিওর”। স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রীভূত কাঠামো, শহর-গ্রামের বৈষম্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং শিশুস্বাস্থ্যকে ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে একদিকে শিশু রোগীর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে আইসিইউ বেড, অক্সিজেন, প্রশিক্ষিত জনবল ও আইসোলেশন সুবিধার ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। 


তবে এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—এই মৃত্যুগুলোর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। হাম এমন একটি রোগ, যার কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বহু বছর ধরেই বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্পষ্টভাবে বলছে, হাম প্রতিরোধের জন্য অন্তত ৯৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে বহু শিশু এখনো টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে বস্তি এলাকা, চরাঞ্চল, দূরবর্তী গ্রাম এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। 


একজন জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই পরিস্থিতি আকস্মিক নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। কিন্তু একজন মানবিকবোধ সম্পন্ন মানুষ হিসেবে যখন আমরা ভাবি—চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু মানে চার শতাধিক পরিবারে শোকের মাতম, অসংখ্য মায়ের বুকফাটা কান্না, বাবার অসহায়ত্ব, ভাইবোনের শূন্যতা—তখন বিষয়টি আর শুধু “পরিসংখ্যান” থাকে না। প্রতিটি মৃত্যু একটি অসমাপ্ত ভবিষ্যৎ, একটি থেমে যাওয়া স্বপ্ন। কোনো মা হয়তো এখনো সন্তানের খেলনা গুছিয়ে রাখছেন, কোনো বাবা হাসপাতালের করিডোরে শেষবারের মতো সন্তানের মুখ দেখার স্মৃতি ভুলতে পারছেন না। এই মানবিক বেদনা রাষ্ট্র, সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ ইতোমধ্যে বাংলাদেশে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। সরকারও জরুরি ভিত্তিতে শিশুদের টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন দিয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। 


বাংলাদেশের বর্তমান হাম-রুবেলা সংকট আমাদের স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কার্যকর করে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ জন্য প্রথমেই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও সুসংহত ও টেকসই করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম যেন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক দুর্বলতা কিংবা অর্থায়ন সংকটের কারণে ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা ও নগর বস্তির প্রতিটি শিশুর কাছে টিকা পৌঁছে দিতে হবে সমান গুরুত্বের সঙ্গে। কারণ একটি শিশুও যদি টিকার বাইরে থেকে যায়, তবে পুরো সমাজই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।


একই সঙ্গে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী শক্তিশালী রোগ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ও রিয়েল-টাইম ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা চালু করা গেলে দ্রুত রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হবে এবং প্রাদুর্ভাব বড় আকার ধারণ করার আগেই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।


বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত শিশু আইসিইউ, অক্সিজেন সাপোর্ট, আইসোলেশন ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব রয়েছে। ফলে সংকটের সময় অধিকাংশ রোগীকে ঢাকামুখী হতে হয়, যা শুধু রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়ায় না, বরং অনেক দরিদ্র পরিবারকে অসহনীয় ভোগান্তির মধ্যেও ফেলে। তাই স্বাস্থ্যসেবাকে ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে সারাদেশে সমানভাবে বিস্তৃত করতে হবে।


পাশাপাশি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের বস্তি এলাকা, চরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও দুর্গম পার্বত্য এলাকায় এখনো বহু শিশু নিয়মিত টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এসব অঞ্চলে মোবাইল ভ্যাকসিনেশন টিম, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ বাড়ানো না গেলে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য আরও গভীর হবে।


জনসচেতনতা বৃদ্ধিও এই সংকট মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এখনো অনেক পরিবার টিকা নিয়ে ভয়, গুজব বা ভুল তথ্যের কারণে দ্বিধায় থাকে। এই ভুল ধারণা দূর করতে গণমাধ্যম, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন এবং কমিউনিটি নেতাদের সম্পৃক্ত করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। মানুষের আস্থা তৈরি না হলে কোনো টিকাদান কর্মসূচিই শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব নয়।


সবশেষে, শিশুস্বাস্থ্যকে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একটি সুস্থ শিশু মানে একটি সুস্থ পরিবার, আর সুস্থ পরিবারই একটি শক্তিশালী জাতির ভিত্তি। বাংলাদেশ অতীতেও স্বাস্থ্য খাতে বহু সাফল্যের নজির স্থাপন করেছে। তাই সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর মানবিক দায়বদ্ধতা থাকলে এই সংকট থেকেও উত্তরণ সম্ভব। কারণ প্রতিটি শিশুর জীবন আমাদের কাছে অমূল্য—শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান

ফোন : +8801609378100, ই-মেইল: kolom24news@gmail.com