মো. নূর নবী শেখ
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং’ বা সংক্ষেপে ‘র’। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, আন্তর্জাতিক সীমান্তে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও কভার্ট অপারেশন পরিচালনায় সংস্থাটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এর উৎপত্তি, কাজের ধরন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌতূহল রয়েছে।
যেভাবে প্রতিষ্ঠা হয় ‘র’
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি ও ভুল বার্তার কারণে কৌশলগত সুবিধা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল ভারত। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার সময় পাকিস্তানের কাছে অস্ত্রের ঘাটতি থাকলেও সে তথ্য ভারতের কাছে ছিল না। এই ব্যর্থতা পর্যালোচনার পর পৃথক বহির্দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এবং ১৯৬৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘র’।
সংস্থাটির প্রথম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন রামেশ্বর নাথ কাও, আর তার ২ নম্বর কর্মকর্তা ছিলেন শঙ্করণ নায়ার। শুরুতে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) থেকে বদলি হওয়া ২৫০ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে নতুন সংস্থার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৭১ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে সরাসরি তরুণদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হলেও বৈষম্য কাটাতে ১৯৭৩ সালের পর কঠিন প্রতিযোগিতামূলক মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা ও ভাইভার মাধ্যমে নিয়োগের নিয়ম চালু হয়।
বর্তমান নিয়োগ পদ্ধতি
সময়ের সঙ্গে ‘র’-এর নিয়োগ পদ্ধতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমানে সংস্থাটির ৯৫ শতাংশেরও বেশি কর্মকর্তা ভারতীয় পুলিশ সেবা বা আইপিএস থেকে প্রাক-বাছাইয়ের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এর বাইরে অর্থনৈতিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও রাজস্ব অপরাধ তদারকির জন্য কাস্টমস ও আয়কর বিভাগ থেকেও কিছু বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা নেওয়া হয়।
তবে এই পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ বা তার বেশি বয়সে আইপিএস কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা সংস্থায় আনা হলে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমে যায়। এ ছাড়া ভাষা শেখা, সাইবার সিকিউরিটি, ক্রিপ্টোগ্রাফি ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক অনুসন্ধানের বিশেষ কৌশল পুলিশের চাকরিতে শেখানো হয় না বলেও তারা মনে করেন।
এজেন্টদের কঠোর প্রশিক্ষণ
বাছাই হওয়ার পর প্রত্যেক কর্মকর্তাকে প্রাথমিক ও উচ্চতর ফিল্ড প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাদের বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট বিদেশি ভাষা শেখানো হয়, পাশাপাশি প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকা, শত্রুর নজরদারি এড়িয়ে অনুপ্রবেশ ও ছদ্মবেশ ধারণের কৌশলও শেখানো হয় ফিল্ড প্রশিক্ষণে।
আত্মরক্ষার জন্য এজেন্টদের শেখানো হয় ইসরায়েলি বিশেষ মার্শাল আর্ট ‘ক্রাভ মাগা’, যা মুখোমুখি হাতাহাতি লড়াইয়ে কার্যকর। এ ছাড়া সংকেত আদান-প্রদানের জন্য এনক্রিপশন ভাষা এবং গোপন তথ্য বিনিময়ের জন্য প্রাচীন পদ্ধতি ‘ডেড লেটার বক্স’ ব্যবহারের কৌশলও তাদের শেখানো হয়।
আন্ডারকাভার পোস্টিং ও বহিষ্কারের ঝুঁকি
বিদেশে বিভিন্ন মিশন পরিচালনার সুবিধার্থে ‘র’-এর এজেন্টদের ভারতীয় দূতাবাসগুলোতে কূটনীতিক বা ‘আন্ডারকাভার’ হিসেবে পোস্টিং দেওয়া হয়। তথ্য গোপন রাখতে অনেক কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের আসল নাম বদলে ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়।
কোনো এজেন্টের পরিচয় প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে যেতে হয়, কূটনৈতিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘পারসোনা নন গ্রাটা’। এ ছাড়া দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যকার বিশেষ প্রোটোকল মেনেই গোয়েন্দাদের গতিবিধি ও সীমানা রক্ষা করতে হয়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com