৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
preview
ক্যান্সার আক্রান্ত ছেলেকে বাঁচাতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সৎ মা

মো. নূর নবী শেখ

সমাজে প্রচলিত আছে সৎ মা মানেই হলো সন্তানদের জন্য অভিশাপ। তবে সেই ধারণা বদলে দিলেন বরিশালের সৎ মা জরিনা আক্তার। যিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত এক পা বিহীন পঙ্গু ছেলেকে বাঁচাতে করছেন লড়াই।

কখনো তিনি অসুস্থ ১৭ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালে, আবার কখনো ছেলের চিকিৎসার অর্থ জোগাতে সাহায্য চাইছেন মানুষের কাছে। ছেলের জন্য সৎ মায়ের এমন ভালোবাসা আশা জাগিয়েছে মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত জুবায়েরের বেঁচে থাকার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর সাগরদী, টিয়াখালী রোডের হাওলাদার বাড়ির ইলেক্ট্রিশিয়ান আল আমিন মৃধার প্রথম স্ত্রীর সন্তান জুবায়ের। ২০১৯ সালের এপ্রিলে করোনা মাহামারির সময় মাকে হারায় শিশু জুবায়ের।

মা হারা তিন এতিম ছেলে-মেয়ের দেখভালের জন্য ২০২২ সালে জরিনা আক্তারকে বিয়ে করে আনেন ইলেক্ট্রিশিয়ান আল আমিন মৃধা। বর্তমানে তাদের সংসারে তিন মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে জুবায়ের।

জুবায়ের জানায়, তার মা খুশি বেগম মারা যাওয়ার পর তীব্র অর্থ সংকটে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। শিশু বয়সেই বাবার সাথে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করে সংসারের হাল ধরেন তিনি। পরবর্তীতে বাবা জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় গেলে বরিশালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয় জুবায়ের। তবে দেড় বছর আগে ইজিবাইক দুর্ঘটনা তার পুরো জীবনকে থমকে দেয়।

জুবায়ের জানান, বরিশাল ব্যাটারিচালিত ইজিবাকে যাত্রী হয়ে ফিরছিলেন তিনি। পথে নগরীর কালিজিরা ব্রিজ এলাকায় ইজিবাইকটি উল্টে গিয়ে তার বাম পায়ে গুরুতর আঘাত পান। চিকিৎসায় সাড়া না পাওয়ায় হাঁটুর ওপর থেকে কেটে ফেলতে হয় তার পা।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে সেই ক্ষতস্থানে টিউমার দেখা দেয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারি বিরল ‘সারকোমা’ ক্যান্সারে আক্রান্ত তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শে এ পর্যন্ত ঢাকায় ৫টি কেমোথেরাপি নিয়েছে জুবায়ের, যার প্রতিটিতে খরচ হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে। আর দুর্ঘটনার পর থেকে এ পর্যন্ত চিকিৎসা বাবদ প্রায় ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে তার পরিবারটি এখন নিঃস্ব।

বর্তমানে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের সাবেক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. তরিৎ কুমার সমাদ্দারের অধীনে চিকিৎসাধীন জুবায়ের। চিকিৎসক জানান, জুবায়েরের শরীরে ‘সারকোমা’ ক্যান্সার এখন ফুসফুসের কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ছে। তাকে প্রতি ২১ দিন পর পর কেমোথেরাপি দিতে হবে। এজন্য প্রতিবার খরচ হবে ৫০ হাজার টাকা। তবে ঢাকায় নিয়ে তার জরুরি অপারেশন প্রয়োজন।

কিন্তু জুবায়েরের চিকিৎসা দূরের কথা, ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ যোগানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন তার বাবা আল আমিন মৃধার। তার ওপর ১০-১৫ দিন আগে ঢাকায় ইজিবাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে বাবা আল আমিন নিজেই এখন অসুস্থ। কিন্তু ছেলের চিকিৎসার চিন্তায় নিজের চিকিৎসাও করাচ্ছেন না তিনি।

তবে হাল ছাড়েননি সৎ মা জরিনা আক্তার। ছেলেকে বাঁচাতে মানুষের দ্বারে ঘুরছেন তিনি। ছেলেকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে সব কিছুই করছেন জরিনা।

তিনি বলেন, ‘আমি ওকে কখনো সৎ সন্তানের মতো দেখিনি, নিজের পেটের সন্তানের থেকেও বেশি ভালোবাসী। যে কারণে ওর কষ্টটাও আমি উপলব্ধি করতে পারি। আমি চাই মা হারা এতিম ছেলেটা অন্তত এক পা নিয়ে হলেও বেঁচে থাকুক। ওর বাবার পক্ষে আর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব না। সরকারি আর্থিক সহায়তার জন্য বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করেছি। কিন্তু আগামী ডিসেম্বরের আগে কোনো অনুদান পাওয়া সম্ভব নয় বলে সেখান থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই কোন উপায় না পেয়ে মানুষের কাছে সাহায্যের হাত পেতেছি।’

স্থানীয়রা জানান, এলাকাবাসীর উদ্যোগে টাকা তুলে প্রথম দফায় জুবায়েরের চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু এখন আবার টাকার প্রয়োজন। টাকার অভাবে বর্তমানে বিছানায় শুয়ে নীরবে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন কিশোর জুবায়ের। সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে হয়তো বেঁচে থাকার আশা খুঁজে পাবে এতিম কিশোর জুবায়ের।


সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা:

বিকাশ (মা): ০১৯২৩-৮২৩৫৪৯, ব্যাংক হিসাব: আলামিন হিসাব নম্বর- ৩৪১৮০১০০২০০৭৪, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, সাগরদী বাজার কর্পোরেট শাখা, বরিশাল।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com