মো. নূর নবী শেখ
সকালে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করা, মুখ ধোয়া এবং প্রয়োজন হলে মাউথওয়াশ ব্যবহার করা, অনেকের কাছে এটুকুই মুখের যত্ন। দাঁতে ব্যথা না হলে বা বড় কোনো সমস্যা দেখা না দিলে দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনও অনেকে অনুভব করেন না।
কিন্তু মুখের স্বাস্থ্য শুধু দাঁত ঠিকঠাক থাকার বিষয় নয়। মুখের ভেতরের দাঁত, মাড়ি ও অন্যান্য টিস্যুর সুস্থতার সঙ্গে খাওয়া, কথা বলা, হাসা, সামাজিক যোগাযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং জীবনযাত্রার মানের সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও মুখের স্বাস্থ্যকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
দাঁত হলুদ হওয়া, মুখে দুর্গন্ধ, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া বা দাঁত নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা অনেক সময় একজন মানুষের নিজের প্রতি ধারণা ও সামাজিক আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে মুখের কোনো রোগে ব্যথা বা অস্বস্তি থাকলে খাওয়া, কথা বলা কিংবা স্বাভাবিক কাজ করাও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
মুখের স্বাস্থ্য আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে
হাসি মানুষের সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারও দাঁতে গর্ত, দাঁত ভেঙে যাওয়া, দাঁত পড়ে যাওয়া, মাড়ির সমস্যা বা মুখে দুর্গন্ধ থাকলে তিনি অনেক সময় অন্যের সামনে হাসতে বা কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
এ ধরনের অস্বস্তি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়। মুখের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে এবং সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞাতেও মুখের স্বাস্থ্যের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, ভালো থাকা এবং ব্যথা বা অস্বস্তি ছাড়া সামাজিকভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ মুখের স্বাস্থ্য ভালো থাকা মানে শুধু দাঁতে কোনো গর্ত না থাকা নয়। স্বাভাবিকভাবে হাসতে পারা, কথা বলতে পারা এবং অন্যের সঙ্গে যোগাযোগের সময় অস্বস্তি না থাকাও এর অংশ।
মুখের সমস্যা সামাজিক জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে
মুখে দুর্গন্ধ বা দাঁতের দৃশ্যমান সমস্যা থাকলে কেউ কেউ অন্য মানুষের খুব কাছাকাছি গিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। সামাজিক অনুষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রের বৈঠক বা নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের সময়ও এই অস্বস্তি আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে মুখের দুর্গন্ধ মানেই দাঁতে বড় কোনো রোগ হয়েছে, এমন নয়। এর পেছনে মুখের অপরিচ্ছন্নতা, মাড়ির রোগ, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, কিছু খাবার বা অন্য শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধকে শুধু মাউথওয়াশ দিয়ে ঢেকে না রেখে কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, মুখের স্বাস্থ্য মানুষের সামাজিকভাবে অংশ নেওয়া এবং ব্যথা, অস্বস্তি বা বিব্রতবোধ ছাড়া কাজ করার সক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দাঁতের রোগে শুধু দাঁতই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না
দাঁতে ক্ষয় বা গর্ত, মাড়ির রোগ, দাঁত পড়ে যাওয়া এবং মুখের অন্যান্য রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসা না করলে এসব সমস্যা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে।
দাঁতে ব্যথা থাকলে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হতে পারে। খেতে সমস্যা হতে পারে। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। ব্যথা বা অস্বস্তির কারণে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও অনুপস্থিত থাকতে হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, মুখের রোগের ব্যথা ও অস্বস্তি মনোযোগে সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
মাড়ির রোগকে অবহেলা করা ঠিক নয়
অনেকেই দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে সামান্য রক্ত পড়াকে স্বাভাবিক বলে মনে করেন। কিন্তু বারবার মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া বা মুখে দীর্ঘদিন দুর্গন্ধ থাকা মাড়ির রোগের লক্ষণ হতে পারে।
মাড়ির রোগের প্রাথমিক পর্যায়কে gingivitis বলা হয়। চিকিৎসা না করলে এটি আরও গুরুতর periodontal disease-এ পরিণত হতে পারে। তখন দাঁতকে ধরে রাখা হাড় ও অন্যান্য টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত দাঁত নড়বড়ে হয়ে পড়ে যেতে পারে।
তাই শুধু দাঁতের ওপর নজর না দিয়ে মাড়ির অবস্থার দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।
মুখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে শরীরের স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক আছে
মুখ ও শরীরকে আলাদা দুটি বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মুখের বিভিন্ন রোগের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য রোগেরও সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও মাড়ির রোগের মধ্যে সম্পর্কের কথা WHO উল্লেখ করেছে। ডায়াবেটিস periodontitis-এর বিকাশ ও অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। আবার মুখের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার পেছনে যে ঝুঁকিগুলো কাজ করে, যেমন অতিরিক্ত চিনি, তামাক ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সেগুলোর অনেকগুলোই অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দাঁতের একটি সমস্যা সরাসরি হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো রোগ সৃষ্টি করবে। মুখের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের মধ্যে সম্পর্কটি জটিল এবং রোগভেদে এর প্রকৃতি আলাদা।
অতিরিক্ত চিনি কেন দাঁতের জন্য ক্ষতিকর?
মুখের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে খাবারের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে sugar free বা খাবার ও পানীয়তে থাকা অতিরিক্ত চিনি দাঁতের ক্ষয়ের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি।
দাঁতের ওপর plaque জমে। খাবার ও পানীয়ের sugar free থেকে এই plaque-এর ব্যাকটেরিয়া অ্যাসিড তৈরি করতে পারে। নিয়মিত ও বেশি চিনি গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত মুখের পরিচর্যার অভাবে এই অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সময়ের সঙ্গে দাঁতে ক্ষয় বা ক্যাভিটি তৈরি হতে পারে।
তাই শুধু মিষ্টি খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করলেই হবে না। প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসেও অতিরিক্ত মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ কমানো দরকার।
চোখের পাওয়ার মিলে গেলেই কি অন্যের চশমা পরা যাবে
তামাক মুখের জন্য বড় ঝুঁকি
ধূমপান শুধু ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর নয়। তামাক মুখের স্বাস্থ্যেও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
তামাক ব্যবহারের সঙ্গে মাড়ির রোগের সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে মুখের ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। WHO মুখের রোগ প্রতিরোধে সব ধরনের তামাক ব্যবহার বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশে ধূমপানের পাশাপাশি জর্দা, গুল ও অন্যান্য ধোঁয়াবিহীন তামাক ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। মুখের ভেতরে দীর্ঘদিন কোনো ক্ষত, সাদা বা লাল দাগ, অস্বাভাবিক গুটি বা না শুকানো ঘা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে প্রতিদিন কী করবেন?
মুখের যত্নের জন্য খুব জটিল কোনো ব্যবস্থা প্রয়োজন নেই। নিয়মিত কিছু অভ্যাসই বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করুন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা fluoride-containing toothpaste দিয়ে দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করার পরামর্শ দেয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহারের জন্য সাধারণভাবে ১০০০ থেকে ১৫০০ পিপিএম fluoride-যুক্ত পেস্ট ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
মিষ্টি ও চিনিযুক্ত পানীয় কমান: চা বা কফিতে অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, মিষ্টি, কেক, বিস্কুটসহ চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত বেশি খেলে দাঁতের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিমাণ ও খাওয়ার ঘনত্ব দুটিই বিবেচনায় রাখা ভালো।
মাড়ির দিকে নজর দিন: ব্রাশ করার সময় নিয়মিত রক্ত পড়া, মাড়ি ফুলে যাওয়া বা দীর্ঘদিন মুখে দুর্গন্ধ থাকলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না।
তামাক এড়িয়ে চলুন: সিগারেট, জর্দা, গুলসহ সব ধরনের তামাক মুখের জন্য ক্ষতিকর। এগুলো এড়িয়ে চলা মুখ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
দাঁতের সমস্যা হলে দেরি করবেন না
দাঁতে সামান্য ব্যথা বা ছোট গর্তকে অনেকেই দীর্ঘদিন অবহেলা করেন। কিন্তু শুরুতেই চিকিৎসা করলে অনেক সমস্যা সহজভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। WHO জানিয়েছে, অধিকাংশ সাধারণ মুখের রোগ প্রতিরোধযোগ্য এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসাযোগ্য।
শুধু সুন্দর হাসি নয়, স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্যও জরুরি
মুখের স্বাস্থ্যকে অনেক সময় সৌন্দর্য বা সুন্দর হাসির সঙ্গে বেশি যুক্ত করা হয়। কিন্তু এর গুরুত্ব আরও অনেক বেশি।
সুস্থ দাঁত ও মাড়ি থাকলে খাবার চিবিয়ে খাওয়া সহজ হয়, কথা বলতে সমস্যা কম হয় এবং সামাজিক যোগাযোগে অস্বস্তিও কম থাকে। বিপরীতে দাঁতের ব্যথা, মাড়ির রোগ বা দাঁত পড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দীর্ঘদিন চললে জীবনযাত্রার মান কমতে পারে। WHO বলছে, মুখের স্বাস্থ্য সাধারণ স্বাস্থ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি মানুষের সামাজিক অংশগ্রহণ ও সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত।
তাই মুখের যত্নকে শুধু দাঁতের সৌন্দর্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। প্রতিদিনের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, সুষম খাদ্য, তামাক এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে সময়মতো দাঁতের চিকিৎসা নেওয়া, সব মিলিয়েই ভালো মুখের স্বাস্থ্য তৈরি হয়।
একটি সুন্দর হাসি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই হাসির পেছনে থাকা সুস্থ দাঁত, মাড়ি ও মুখ। মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখা তাই ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের পাশাপাশি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com