২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
preview
ট্রাম্প-শি শীর্ষ বৈঠক: আনুষ্ঠানিকতার নেপথ্যে এআই প্রতিযোগিতা ও গভীর মতভেদ

মো. নূর নবী শেখ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ওয়াশিংটনে এক রাষ্ট্রীয় সফরে স্বাগত জানাচ্ছেন। বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে এই বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতির প্রত্যাশা কম। তাই মূল পলিসি বা নীতির চেয়ে সফরটির আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরই প্রাধান্য পাচ্ছে।

বুধবার সন্ধ্যায় বিমানবন্দরে শি জিনপিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিউয়ানকে ট্রাম্প নিজেই অভ্যর্থনা জানান। সাম্প্রতিক ইতিহাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কর্তৃক চীনা প্রেসিডেন্টকে বিমানবন্দরে সরাসরি অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা এটিই প্রথম। শুক্রবার বিদায়ের আগে দুই নেতার মধ্যে বাণিজ্য ও তাইওয়ানসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা হবে এবং ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হবে।

২০১৫ সালের পর ওয়াশিংটনে এটি শি জিনপিংয়ের প্রথম সফর। দুই পক্ষই এই সফর থেকে খুব বড় কোনো সাফল্য বা কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি-কোনোটারই উচ্চ আশা প্রকাশ করছে না। রোববার নিউইয়র্কে প্রাথমিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ইতিবাচক হলেও আগামী নভেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া শুল্ক বিরতি  বাড়ানোর বিষয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ (ঈঝওঝ)-এর এশিয়া বিষয়ক সাবেক মার্কিন কূটনীতিক এডগার্ড কেগান বলেন, “এই সফরটি নিজেই একটি বড় বার্তা। বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনের বিষয়ে দুই পক্ষেরই নীরবতা স্পষ্ট। সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখাই মূলত এর প্রধান উদ্দেশ্য।”

বৈঠকটি সৌহার্দ্যপূর্ণ রাখার ইঙ্গিত হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মঙ্গলবার দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প চীনের নাম মাত্র একবার উল্লেখ করেন। তবে বেইজিংয়ের তীব্র সমালোচক জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচির সঙ্গে আলাপে তিনি শি জিনপিংয়ের সফরের কথা তুলে ধরেন।

তবে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আড়ালে গভীর মতভেদ রয়েই গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় চীনের আধিপত্য রুখতে সক্রিয়। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেছেন, “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় চীন জয়ী হলে কারও জন্যই শুভ হবে না।” পাশাপাশি, গত বছরের বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে দুর্লভ খনিজ সরবরাহে চীনা ধীরগতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প উৎস খুঁজছে।

অন্যদিকে, চীনা কর্মকর্তাদের মূল দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের তাইওয়ান অস্ত্র চুক্তি ঠেকানোর দিকে। স্বশাসিত এই দ্বীপটিকে চীন নিজস্ব ভূখণ্ড মনে করে। নানজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন জু ফেং বলেন, “বৈঠকের ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা, যুক্তরাষ্ট্রের এআই সংক্রান্ত উদ্বেগকে কিছুটা প্রশমিত করা এবং তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিংয়ের অবস্থান কঠোর রাখাই হবে চীনের প্রধান লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা থাকায় তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে।”

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক চাপ

সফরটি উভয় নেতার জন্যই একটি সংবেদনশীল সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ৮০ বছর বয়সী ট্রাম্প আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য পরাজয় এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকিতে রয়েছেন। অন্যদিকে, ৭৩ বছর বয়সী শি জিনপিং ঐতিহাসিক চতুর্থ মেয়াদের দিকে এগোলেও চীনা অর্থনীতি ও তরুণদের বেকারত্ব নিয়ে চাপে আছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই সফর নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা রয়েছে। মার্কিন সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান ও মিসিসিপির রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার সফরের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “হোয়াইট হাউস আমার পরামর্শ চাইলে আমি শি জিনপিংকে ওয়াশিংটনে এত জমকালো অভ্যর্থনা না জানানোর পরামর্শ দিতাম।”

চীনা কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল এবার প্রেসিডেন্ট শি-র সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসেনি। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে চীনা বিনিয়োগ কমেছে। চীনের গাড়ি মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে কি না-সে বিষয়েও ট্রাম্পের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন কর্মী নিয়োগ দিলে চীনা কারখানা স্থাপনে ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত আগে তিনি দিয়েছিলেন, যদিও তা জাতীয় নিরাপত্তার শর্তসাপেক্ষ।

এদিকে এআই ও প্রযুক্তি খাত নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা চরমে। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে আধুনিক হিউম্যানয়েড রোবট ও ইনভার্টার আমদানি নিষিদ্ধ করেছে এবং চীনের শীর্ষ টেক ফার্মগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এর জবাবে বেইজিং মার্কিন বাণিজ্য সীমিত করেছে এবং ড্রোন রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। তবে বাণিজ্য চুক্তি পুরোপুরি নষ্ট করার মতো পদক্ষেপ কোনো পক্ষই নেয়নি।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্য ও দুর্লভ খনিজ রপ্তানি বিষয়ে চীনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের দুর্লভ খনিজ রপ্তানি ২১% কমলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর সর্বোচ্চ। প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞার মুখেও চীনের চিপ শিল্প এগোচ্ছে। চীনা টেক জায়ান্ট হুয়াওয়ে তাদের নতুন প্রজন্মের এআই চিপ আনছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এমন এক সময়ে এই বৈঠক হচ্ছে যখন ট্রাম্প দেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে নিজের ক্ষমতার প্রয়োগ বাড়াচ্ছেন। ট্রাম্প বারবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক স্কট কেনেডি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র মূলত শি জিনপিংকে বেশ ছাড় দিচ্ছে এবং চীনকে আমরা খুব একটা কার্যকরভাবে চাপে রাখতে পারছি না।”

সূত্র: এনডিটিভি


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com