২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
preview
কুমিল্লায় তিন দফায় আটক ১২৯৩, ধরাছোঁয়ার বাইরে গ্যাং লিডাররা

মো. নূর নবী শেখ

কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে গত পাঁচ দিনে তিন দফায় ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। সর্বশেষ রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে চালানো অভিযানে আটক করা হয়েছে আরও ৪১৫ জনকে। এর আগে দুই দফার অভিযানে আটক করা হয় ৮৭৮ জনকে।

পুলিশ বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি গ্যাং লিডারদেরও আটক করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্যাংয়ের নেতৃত্বদানকারী অনেকেই এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব গ্যাং গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে তাদের।

গত রোববার সন্ধ্যা ৭টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় জেলা পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সমন্বয়ে অভিযান চালানো হয়। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে এমন স্থান, কিশোরদের আড্ডাস্থল ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪১৫ জনকে আটক করা হয়।

কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জানান, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টার অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪৬ কিশোরকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ১০৮ জনের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং-সংক্রান্ত অপরাধ, মাদক ব্যবসা ও সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এর এক দিন আগে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৪৫১ জন কিশোরকে মুচলেকায় পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়। অপর ১৭৩ জনকে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হয়। সব মিলিয়ে তিন দফায় ১ হাজার ২৯৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ।

আলোচনায় রতন গ্রুপ
শনিবারের অভিযানে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা এলাকায় ৩৭ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিত আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯) রয়েছেন। একই অভিযানে রতন গ্রুপের তারেকসহ আরও চার কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করা হয়।

কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, আনিক নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশেমের ছেলে এবং রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের ভাগনে। রতন আত্মগোপনে থাকায় আনিক গ্যাংটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন বলে দাবি পুলিশের।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আনিক ২০২২ সালের একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে তিনি আবারও গ্যাংয়ের নেতৃত্বে যুক্ত হন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রতন গ্রুপের পাঁচ সদস্যকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নগরের সুজানগর এলাকা থেকে অস্ত্রসহ ফাহিম নামে এক কিশোর গ্যাং সদস্যকেও আটকের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

২৪টির বেশি গ্যাংয়ের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুমিল্লা মহানগরীতে ২৪টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অনুসন্ধানে ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ’, ‘রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড’, ঈগল গ্রুপ, র‌্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড, ক্রাইম সেটআপ ও কেবি গ্যাংসহ বিভিন্ন নামের গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

টমছমব্রিজ, সালাহউদ্দিন রোড, ঠাকুরপাড়া, বিসিক এলাকা, ধর্মপুর, রেইসকোর্স, কাঠের পুল, হাউজিং এস্টেট, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, কাপ্তানবাজার, অশোকতলা, পার্ক রোড, মোগলটুলি, নবাববাড়ি রোড, ইপিজেড রোড, মেডিকেল কলেজ রোড, শাসনগাছা, কাটাবিল, নুরপুর, কোটবাড়ি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাদুঘর রোড, সালমানপুর ও সানন্দা এলাকায় এসব গ্যাংয়ের তৎপরতা বেশি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মহানগরীর বাইরে সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, দাউদকান্দি, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলাতেও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দৌরাত্ম্য ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

অপ্রতিম হত্যা ঘিরে নতুন করে আলোচনা
দেশজুড়ে আলোচিত অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা মহানগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, বিভিন্ন গ্যাংয়ের সদস্যদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ভিডিও, ছবি, গ্রুপের নাম ও নেতৃত্বদানকারীদের পরিচয় পুলিশকে মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে গ্যাংয়ের সদস্যরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে দাবি তাঁদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অপ্রতিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) কোটবাড়ির একটি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর গ্যাং-সংশ্লিষ্টতার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন। তবে তুহিনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড হলেও তাঁর কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের বিষয়টি পুলিশ পরিষ্কার করেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অপ্রতিম হত্যা মামলার অপর দুই আসামি মোজাম্মেল হোসেনের ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৮) ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন বলেও স্থানীয়দের দাবি। তাদের ভাষ্য, আলী সাইমন ও সোহাগ নামে দুই কিশোর গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছেন এবং মোহাম্মদ হানজালা ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয়দের দাবি, আলী সাইমন, সোহাগ ও হানজালার নেতৃত্বাধীন ওই গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে অপ্রতিমের আড্ডা ও শোডাউনের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়েছে। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গ্যাংটির নেতৃত্বদানকারীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অপ্রতিম হত্যার আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এ ছাড়া সদর দক্ষিণের বড় ধর্মপুরের রায়হান (১৯), ফাহাদ (১৯), ফকির মুড়ার শান্ত (১৮), ইমরান (২১), সানি (১৮) এবং রাকাশের পাড় এলাকার সায়মন (১৮)-এর বিরুদ্ধেও বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাদের কয়েকজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে ছবি ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য রয়েছে।

রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
স্থানীয় নাগরিকদের অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে রাজনৈতিক ছত্রছায়া থাকায় নেতৃত্বদানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, গ্যাংয়ের নেতারা সেই দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে এসব গ্যাংকে ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি তাঁদের নেতৃত্বদানকারীদের আটক করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বড় বাধা। তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে সুযোগ বুঝে এসব গ্যাংকে ব্যবহার করা হয়।

কিশোর গ্যাং সদস্যদের আটক করা হলেও গ্যাং লিডাররা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে— এমন প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, গত কয়েক দিনে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের পাশাপাশি গ্যাং লিডারদেরও আটক করা হয়েছে। আরও অনেক গ্যাং লিডার পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন এবং তাঁদেরও আটক করা হবে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, রতন গ্রুপের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ আনিকসহ বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বদানকারীকে আটক করা হয়েছে। আলোচনায় থাকা কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপের বিষয়েও তদন্ত চলছে। কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com