মো. নূর নবী শেখ
জাতিসংঘের দশম মহাসচিব হওয়ার প্রতিযোগিতায় সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তবে, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের বিরোধিতার কারণে এখনো কোনো প্রার্থীই স্পষ্টভাবে এগিয়ে যেতে পারেননি। এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক অনানুষ্ঠানিক ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকেন। নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
তবে রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য- নিরাপত্তা পরিষদের এই ৫ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকের কাছ থেকেই প্রার্থীরা অন্তত দুটি করে বিরোধিতার ভোট পেয়েছেন। মহাসচিব নির্বাচনে স্থায়ী সদস্যদের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখনো কারও জয় নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন কূটনীতিক ও পর্যবেক্ষকেরা।
নতুন মহাসচিবকে একাধিক যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অনুদান কমে যাওয়া এবং সংস্থাটির রাজনৈতিক প্রভাব হ্রাসের মতো বড় চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে। ওয়াশিংটন জাতিসংঘের কয়েক ডজন সংস্থা থেকে সরে যাওয়ায় ১৯৩ সদস্যের এ আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে। তার উত্তরসূরি বেছে নিতে নিরাপত্তা পরিষদ এ পর্যন্ত ৬ দফা গোপন ভোট আয়োজন করেছে। পরবর্তী মহাসচিবের নাম সুপারিশ করতে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত নয়টি সমর্থনমূলক ভোট প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউ বিরোধিতা করতে পারবেন না।
শুক্রবারের ভোটে প্রথমবারের মতো রঙিন ব্যালট ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্থায়ী সদস্যদের বিরোধিতা রয়েছে কি না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এতে নির্বাচনপ্রক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ভোটের মধ্যে চারটিতেই ৭০ বছর বয়সী গ্রিনস্প্যান সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। তবে, আগস্টে অনুষ্ঠিত একটি ভোটে গায়ানার জাতিসংঘের রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বার্কেট শীর্ষে ছিলেন।
শুক্রবারের ভোটেও গ্রিনস্প্যান নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। তিনি পেয়েছেন ৯টি সমর্থনমূলক, ৫টি বিরোধিতামূলক এবং একটি ‘মতামত নেই’ ভোট। তার বিরুদ্ধে আসা পাঁচটি বিরোধিতার ভোটের মধ্যে দুটি ছিল নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের কাছ থেকে।
অন্যদিকে, রড্রিগেস-বার্কেট পেয়েছেন ৮টি সমর্থনমূলক, ৬টি বিরোধিতামূলক এবং একটি ‘মতামত নেই’ ভোট। তার বিরুদ্ধেও স্থায়ী সদস্যদের দুটি বিরোধিতার ভোট রয়েছে। জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি প্রায় একই ধরনের ফল পেয়েছেন। তবে, স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে তার প্রতি সমর্থন তুলনামূলক কম।
এ ছাড়া জাতিসংঘের আরও চার সাবেক কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের ক্ষেত্রে সমর্থনের তুলনায় বিরোধিতার ভোট বেশি এসেছে। এতে তাদের প্রার্থিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
কূটনীতিকদের ধারণা, সাবেক ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন দেশের নেতাসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি নতুন করে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ থাকায় নতুন প্রার্থীদের অল্প সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন আদায় করা কঠিন হতে পারে।
নতুন প্রার্থী যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ভোটের পর জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ বলেন, কোনো দেশ আরও প্রার্থী দিতে চাইলে সেটি তাদের সার্বভৌম অধিকার।
২০১৬ সালের অক্টোবরে আন্তোনিও গুতেরেসকে মহাসচিব নির্বাচিত করার আগেও নিরাপত্তা পরিষদকে ছয় দফা প্রাথমিক ভোট নিতে হয়েছিল। জাতিসংঘের আট দশকের বেশি ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিবের দায়িত্ব পাননি।
বৃহস্পতিবার রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিনস্প্যান জানান, তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে ভেটো এলেও তিনি বিস্মিত হবেন না। তবে অতীতের নির্বাচনে এ ধরনের বিরোধিতা কাটিয়ে প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিরোধিতা বা ভেটো এলেও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
গ্রিনস্প্যান আরও বলেন, ‘খেলা এখনো শেষ হয়নি, আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’
কোস্টারিকার এই অর্থনীতিবিদের মতে, জাতিসংঘ বর্তমানে অতিরিক্ত ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতায় ভুগছে। সংস্থাটির পরবর্তী নেতাকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার দায় নেওয়ার সাহস রাখতে হবে এবং ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘জাতিসংঘের শীর্ষ পর্যায়ের পদ কমানো, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস এবং বিভিন্ন সংস্থার একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা জরুরি। শুধু ব্যয় কমিয়ে ক্রমহ্রাসমান সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের সংকটে থাকা জাতিসংঘকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়।’
এ অবস্থায় দশম মহাসচিব নির্বাচনের লড়াইয়ে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও চূড়ান্ত ফল নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সমর্থন ও স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানের ওপর। ডিসেম্বরের শেষ দিকে গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com