মো. নূর নবী শেখ
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়নের ধীরগতি, দুর্নীতি এবং পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য সরকার। দেশটির প্রকাশিত এক তথ্য-অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
চলতি অক্টোবর মাসে যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইটে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি : অক্টোবর ২০২৬’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। দেশটির কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের তিন কর্মকর্তা গত ৭ থেকে ১৫ জুন বাংলাদেশ সফর করে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য তথ্য সংগ্রহ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু করে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে। সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির উন্নতিও হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাজ্য সরকারের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা, মতপ্রকাশ এবং জনপরিসরে বিতর্কে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য বিরোধী গোষ্ঠী সভা-সমাবেশ আয়োজন, নির্বাচনী প্রচার, বিক্ষোভ এবং সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পেয়েছে।
তবে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল। স্থানীয় প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এসব ঘটনার অন্যতম কারণ। ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ছিল এবং আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় সহিংসতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দলটির শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির কারণে দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব এখনো রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্নীতি, সহিংসতা বা দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত নন- এমন তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা সাধারণত নিজেদের এলাকায় বসবাস করতে পারছেন। তবে প্রকাশ্যে দলটির প্রতি সমর্থন জানালে তাদের হয়রানি, সামাজিক বিরূপতা কিংবা সহিংসতার মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া, আগের সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং বেশির ভাগ মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পুলিশের সূত্রের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা মিথ্যা ২১ হাজারের বেশি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার কাজও চলছে।
তবে, সাবেক সরকারের আমল এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের বিক্ষোভ চলাকালে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, কর্মী ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এখনো ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব মামলা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও সাধারণ আদালত- উভয় জায়গায় বিচারাধীন। অভিযুক্ত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। অন্যদিকে, বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেককে আটক রাখা হয়েছে।
সংস্কার বাস্তবায়নের ধীরগতি, দুর্নীতি এবং পুলিশের জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাজ্যের উদ্বেগের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অগ্রগতির কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com