২৯ অক্টোবর ২০২৬
preview
নতুন পেস্কেলের চাপে সরকার, ব্যাংকঋণ নিয়ে বেতন পরিশোধ

মো. নূর নবী শেখ

অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত আর রাজস্ব আদায়ের চরম ব্যর্থতার মাশুল গুনছে গোটা দেশ। নতুন পে-স্কেল বা বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের ফাঁদে পড়ে রাষ্ট্রের কোষাগার আজ আক্ষরিক অর্থেই শূন্য। সরকারি কর্মচারীদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে ব্যয়ের যে বিশাল বোঝা বর্তমান সরকার নিজেদের ঘাড়ে চাপিয়েছে, তা সামলাতে এখন প্রশাসনকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে গিয়ে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার।

রাজস্ব খাদের কিনারে নতুন পে-স্কেলের ফাঁদ

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা এবং শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নিজস্ব আয় বা রাজস্ব বৃদ্ধির কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপরেখা ছাড়াই নতুন পে-স্কেল ঘোষণা ছিল বর্তমান প্রশাসনের একটি চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নথির সূত্র ধরে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় তলানিতে ঠেকলেও, নতুন বেতনকাঠামোর কারণে সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এর বিশ্লেষকদের মতে, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের এই আকাশসমান ফারাকের কারণে রাষ্ট্র এখন একটি ভয়ংকর অর্থনৈতিক ফাঁদে আটকে গেছে, যা বর্তমান সরকারের ভুল নীতিরই ফসল।

ব্যাংক খাতে হাহাকার, ঋণের পাহাড়

বেতন দেওয়ার মতো নিজস্ব টাকা কোষাগারে না থাকায় সরকার মরিয়া হয়ে ঝুঁকছে ব্যাংক খাতের দিকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের নিলামের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সরকার চড়া সুদে ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে সরকারি কর্মচারীদের মাসের বেতন মেটাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাজার থেকে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে সম্প্রতি ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে নিছক দৈনন্দিন ব্যয় সামাল দিতে। উন্নয়নমূলক কাজের বদলে অনুন্নয়ন খাতে ব্যাংক থেকে এভাবে লাগামহীন ঋণ নেওয়ার ফলে দেশের ব্যাংক খাতে এরই মধ্যে তীব্র তারল্য সংকট বা নগদ টাকার হাহাকার শুরু হয়েছে বলে ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক শীর্ষ কর্তা উদ্বেগ জানিয়েছেন।

বেসরকারি খাত ও সাধারণ মানুষের ওপর কোপ

সরকার নিজেই যদি চড়া সুদে ব্যাংক থেকে সব টাকা শুষে নিয়ে শুধু বেতন পরিশোধেই খরচ করে, তাহলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে কোথা থেকে?

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই (FBCCI), এর একাধিক নেতা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে ঠেকেছে।

অন্যদিকে, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম), এর এক অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার কারণে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি তো দূরের কথা, উল্টো উৎপাদন ব্যাহত হয়ে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও লাগামহীন হয়ে পড়ছে।

উল্লেখ্য, দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুদৃঢ় অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া কেবল সাময়িক সন্তুষ্টির জন্য নতুন পে-স্কেলের যে ফাঁদ বর্তমান সরকার তৈরি করেছে, তা থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে না পারলে অচিরেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সম্পূর্ণ মুখ থুবড়ে পড়বে বলে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিবিদরা।


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com