মো. নূর নবী শেখ
শুটিংয়ের দীর্ঘ সময়, পারিশ্রমিক নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা সংগঠনের সদস্যপদ না থাকায় কাজের সুযোগ হারানো; বিনোদন জগতের এসব সমস্যা কমাতে নতুন নিয়ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নতুন নির্দেশিকায় শুটিংয়ের সময়সীমা, ওভারটাইমের মজুরি, লিখিত চুক্তি এবং কর্মীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিতে কাউকে ঢালাওভাবে বয়কট করার প্রবণতা বন্ধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক বিভাগের জারি করা এই নির্দেশিকা চলচ্চিত্র, মেগা সিরিয়াল, ওটিটি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা কিংবা অন্য ভাষার শুটিংয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এর লক্ষ্য প্রযোজক, শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ কমিয়ে কাজের পরিবেশ আরো সুশৃঙ্খল করা।
গিল্ডের সদস্য না হলেও কাজের সুযোগ
নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোনো শিল্পী বা টেকনিশিয়ান যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও শুধু গিল্ড বা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ কিংবা ইউনিয়নের কার্ড না থাকার কারণে তাকে কাজ থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
শুটিংয়ে কতজন টেকনিশিয়ান বা কর্মী প্রয়োজন, তা প্রযোজক বাজেট অনুযায়ী নির্ধারণ করবেন। কোনো সংগঠন নির্ধারিত প্রয়োজনের বাইরে অতিরিক্ত কর্মী নিতে চাপ দিতে পারবে না।
পারিশ্রমিক বাকি থাকা নিয়ে বিরোধের জেরে কাউকে ঢালাওভাবে বয়কট করা কিংবা ইন্ডাস্ট্রি থেকে নিষিদ্ধ করার মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়াকেও বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
শুটিংয়ের সময় ও ওভারটাইমে নতুন নিয়ম
শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের কাজের চাপ কমানো এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে শুটিংয়ের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।নির্দেশিকা অনুযায়ী, সিনেমা ও ওটিটির শুটিংয়ে ১০ ঘণ্টার শিফটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা ওভারটাইম করা যাবে। আবার আট ঘণ্টার শিফট হলে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা ওভারটাইমের বিধান রাখা হয়েছে। মেগা সিরিয়ালের ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার শিফটের সঙ্গে সর্বোচ্চ চার ঘণ্টা ওভারটাইমের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আট ঘণ্টার বেশি কাজ করালে প্রতি ঘণ্টার জন্য স্বাভাবিক মজুরির দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম দিতে হবে প্রযোজককে। পাশাপাশি পরপর দুটি শুটিং শিফটের মধ্যে কর্মীদের অন্তত টানা ছয় ঘণ্টা বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে।
লিখিত চুক্তি ছাড়া শুটিং নয়
কাজ শুরুর আগেই শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করতে হবে। সেই চুক্তিতে কাজের বিবরণ, পারিশ্রমিকের পরিমাণ এবং টাকা দেওয়ার সময় উল্লেখ থাকতে হবে। শ্রম দপ্তরের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম পারিশ্রমিক দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়নি।
শুটিংয়ের পরিবেশ নিরাপদ রাখার বিষয়েও নির্দেশিকায় একাধিক শর্ত রয়েছে। বিশেষ করে গভীর রাতে কাজ শেষ হলে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন খাবার, শৌচাগার, বিশ্রামাগার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে হেনস্থা, বুলিং কিংবা অশোভন আচরণ ঠেকাতে প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থাকে লিখিত মানসম্মত কার্যপদ্ধতি (এসওপি) তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ জানানোর জন্য আলাদা সেল গঠনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল পোর্টাল, স্বাস্থ্যবিমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের উদ্যোগ
তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব সৌমিত্র মোহনের স্বাক্ষরিত নির্দেশিকায় আরো জানানো হয়েছে, রাজ্য সরকার শিগগিরই একটি ডিজিটাল তথ্য পোর্টাল চালু করবে। সেখানে শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের নামের তালিকা, অনলাইন সদস্যপদ এবং শুটিংয়ের অনুমতি-সংক্রান্ত ব্যবস্থা থাকবে।
এছাড়া, বিনোদন জগতের কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের (পিএফ) মতো সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকার।
নতুন নির্দেশিকা বাস্তবায়িত হলে টলিউডে কাজের শর্ত, পারিশ্রমিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নিয়মগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে মানা হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করবে শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের কর্মপরিবেশে পরিবর্তন কতটা আসে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com