মো. নূর নবী শেখ
হাতে থাকা কয়েনের সামনে-পেছনের নকশা কিংবা গায়ে লেখা মূল্যমানের দিকে অনেকেই খেয়াল করেন। কিন্তু কয়েনের চারপাশে থাকা ছোট ছোট খাঁজের দিকে খুব একটা নজর দেওয়া হয় না। অথচ এই খাঁজের পেছনে রয়েছে মুদ্রা জালিয়াতি ঠেকানোর দীর্ঘ ইতিহাস। একসময় মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি কয়েনের ওজন ও প্রকৃত মূল্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এই নকশা।
বর্তমানে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার প্রান্তে মসৃণ, খাঁজকাটা কিংবা লেখাযুক্ত নকশা দেখা যায়। মুদ্রাবিজ্ঞানের পরিভাষায় খাঁজকাটা প্রান্তকে বলা হয় ‘রিডেড’ বা ‘মিলড এজ’। যুক্তরাষ্ট্রের টাকশালের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রার প্রান্তে সমতল, খাঁজযুক্ত, লেখাযুক্ত কিংবা অলংকৃত নকশা থাকতে পারে।
কয়েনের প্রান্তে খাঁজ তৈরির পেছনের ইতিহাস জানতে হলে ফিরে যেতে হবে সেই সময়ে, যখন সোনা ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতু দিয়ে মুদ্রা তৈরি করা হতো। তখন কয়েনের গায়ে লেখা মূল্যমানের পাশাপাশি এর ভেতরে থাকা ধাতুরও আর্থিক মূল্য ছিল।
এই সুযোগ কাজে লাগাত অসাধু ব্যক্তিরা। তারা কয়েনের ধার ঘষে বা কেটে সামান্য পরিমাণে মূল্যবান ধাতু সরিয়ে নিত। কাজটি এত সতর্কতার সঙ্গে করা হতো যে, অনেক সময় বাইরে থেকে মুদ্রাটিকে স্বাভাবিকই মনে হতো। কিন্তু এভাবে বারবার ধাতু সরানোর ফলে কয়েনের ওজন কমে যেত, কমে যেত তার প্রকৃত মূল্যও। মুদ্রা থেকে এভাবে ধাতু কেটে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি পরিচিত ‘কয়েন ক্লিপিং’ নামে।
কয়েন থেকে ধাতু সরানোর এই প্রবণতা ঠেকাতে মুদ্রার প্রান্তে বিশেষ নকশা তৈরির প্রয়োজন দেখা দেয়। সপ্তদশ শতকে মুদ্রা তৈরির প্রযুক্তিতে যান্ত্রিক পরিবর্তন আসার পর খাঁজকাটা বা মিলড প্রান্তের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এর ফলে কেউ কয়েনের ধার কেটে ধাতু সরানোর চেষ্টা করলে প্রান্তের নিয়মিত খাঁজ নষ্ট হয়ে যেত। ফলে সহজেই বোঝা সম্ভব হতো, মুদ্রাটিতে কারসাজি করা হয়েছে কী না। অর্থাৎ, খাঁজগুলো জালিয়াতি শনাক্তের দৃশ্যমান সংকেত হিসেবে কাজ করত। রয়্যাল মিন্টের তথ্য অনুযায়ী, মুদ্রার প্রান্তে এই পরিবর্তন আনার ফলে কয়েন কেটে ধাতু সরানো এবং জালিয়াতি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সময়ের সঙ্গে মুদ্রা তৈরির প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রচলিত অধিকাংশ কয়েন আর সোনা বা রুপার মতো মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি হয় না। তাই পুরোনো দিনের মতো ধাতু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কয়েনের ধার কেটে নেওয়ার আর্থিক সুবিধাও সাধারণত নেই। তারপরও অনেক মুদ্রায় খাঁজকাটা প্রান্তের ব্যবহার রয়ে গেছে। এর একটি কারণ ঐতিহ্য। শত শত বছর ধরে মুদ্রার নকশায় এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাশাপাশি কয়েনের প্রান্তের নকশা মুদ্রা শনাক্ত করতেও সহায়ক হতে পারে। আধুনিক মুদ্রায় খাঁজ, বিশেষ লেখা ও অন্যান্য সূক্ষ্ম নকশা নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
কয়েনের খাঁজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে। স্পর্শের মাধ্যমে মুদ্রার পার্থক্য বুঝতে দৃষ্টিহীন ও কম দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে এসব বৈশিষ্ট্য সহায়ক হয়।
সব দেশে মুদ্রার নকশা এক রকম নয়। তবে কিছু দেশের মুদ্রায় আকার, ওজন ও প্রান্তের খাঁজ এমনভাবে রাখা হয়, যাতে স্পর্শ করেই মুদ্রার মধ্যে পার্থক্য বোঝা সহজ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের টাকশালও দৃষ্টিহীন ব্যক্তিদের জন্য মুদ্রার আকার, ওজন ও খাঁজযুক্ত প্রান্তকে শনাক্তকরণের সহায়ক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে।
অবশ্য শুধু খাঁজের উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে সব ধরনের কয়েন স্পর্শের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। কোন দেশের কোন মূল্যমানের মুদ্রায় কী ধরনের প্রান্ত থাকবে, তা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের নকশা ও মুদ্রাব্যবস্থার ওপর।
আধুনিক মুদ্রায় জালিয়াতি প্রতিরোধে একাধিক কৌশল ব্যবহার করা হয়। এসবের মধ্যে কয়েনের প্রান্তের নকশা, বিশেষ লেখা ও সূক্ষ্ম চিহ্নও রয়েছে। মুদ্রা তৈরির সময় বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে প্রান্তে সমতল, খাঁজযুক্ত কিংবা লেখাযুক্ত নকশা তৈরি করা যায়।
তাই কয়েনের চারপাশে থাকা ছোট ছোট খাঁজ কেবল সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়। একসময় মূল্যবান ধাতু চুরি ঠেকাতে যে নকশার প্রচলন হয়েছিল, তা প্রযুক্তির পরিবর্তনের পরও বিভিন্ন কারণে টিকে আছে। মুদ্রার এই ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জালিয়াতি প্রতিরোধ, নিরাপত্তা এবং মুদ্রা তৈরির ইতিহাস।
সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
ই-মেইল: kolom24news@gmail.com