৮ নভেম্বর ২০২৬
preview
‘সেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাও ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা’

মো. নূর নবী শেখ

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, মানুষের ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, তার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। সেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাও ছিল ৭ নভেম্বরের চেতনা। অর্থাৎ আধিপত্যবাদী শক্তি এবং তাদের এ দেশীয় অনুচররা যতই চেষ্টা করুক, ১৮ কোটি মানুষের এই দেশকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বাংলাদেশকে কখনো আধিপত্যবাদের থাবার মধ্যে নিয়ে আসা যাবে না।’

রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কর্তৃক 'জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস' উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরের সঞ্চালনায় সভাপতিত্ব করেন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। এসময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা মহানগর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

রিজভী বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে আমরা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযথভাবে পালন করতে পারিনি। অথচ ১৯৭৬ সাল থেকেই দিবসটি সরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনামলে দীর্ঘ ১৭ বছর এটি সরকারিভাবে পালন করতে দেওয়া হয়নি। তবে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেক সংগঠন দিবসটি পালন করেছে। ফলে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য কখনো মুছে যায়নি। ৭ নভেম্বরের অন্তর্নিহিত চেতনাও কখনো মুছে যায়নি।’

তিনি বলেন, ‘৭ নভেম্বর শুধু বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার দিন নয়, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো নিশ্চিত হওয়ারও দিন। তবে এর তাৎপর্য শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। ৭ নভেম্বর সেই বিদেশি প্রভাবমুক্ত পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সূচনা করেছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কার সঙ্গে বৈরিতা থাকবে, কার সঙ্গে চুক্তি করবে—এসব বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের নিজস্ব ব্যাপার। এটি কারও নির্দেশে, কারও অঙ্গুলিহেলনে কিংবা কারও কথায় পরিচালিত হবে না।’

বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রদলের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল কতবার প্রবেশের চেষ্টা করেছে! মার খেয়েছে, ফিরে গেছে। আবার এসেছে, আবার মার খেয়েছে, আবার ফিরে গেছে। কিন্তু ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর এই হামলা, তাদের শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্ত কখনো বৃথা যায়নি। সারা দেশের মানুষ এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের শরীর থেকে যে রক্ত ঝরেছে, তা এ দেশের অনেক তরুণ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের চেতনা সৃষ্টি করেছে।’

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে বলেন, ‘যিনি এত মানুষের রক্ত ঝরিয়ে, এত নির্যাতন চালিয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে দেশ পরিচালনা করেছেন, তিনি এখন বলছেন, ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। কিন্তু এ দেশের মানুষের চোখের সামনে এখনো ভাসছে সেই তরতাজা শিশু-কিশোর ও তরুণদের মুখ। যারা বুক পেতে বুলেট গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে মহিমান্বিত গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, সেই বিপ্লব কি মুছে ফেলা যাবে? আবু সাঈদের আত্মত্যাগ, মুগ্ধের আত্মত্যাগ, ওয়াসিম আকরামের আত্মত্যাগ—এসব কি মুছে ফেলা যাবে?’

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা পেয়েছিল। বিগত সাড়ে ১৭ বছর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু গতকাল পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে দিবসটি উদ্‌যাপন করেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত র‍্যালিতে লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এখনো অটুট রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আওয়ামী লীগ বারবার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করেছে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসাজশে ষড়যন্ত্র করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যেভাবে সিপাহি-জনতা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেছিল, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ বারবার প্রমাণ করেছে, এ দেশের ভাগ্য কোনো বিদেশি শক্তি নয়, জনগণই নির্ধারণ করবে। যারা জাকাতের অর্থ ও মধ্যপ্রাচ্যের টাকা বিনিয়োগ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দখলের মাধ্যমে বাংলাদেশ শাসনের স্বপ্ন দেখছে, তাদের সেই স্বপ্ন কখনো পূরণ হবে না।’ জনগণের মনোভাব বুঝে রাজনীতি করার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

রাকিব আরও বলেন, ‘১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রদল রাজপথের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়েছে। ভবিষ্যতেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় ছাত্রদল সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে। যারা দেশের বাইরে থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে চাই, ৫ আগস্ট দেশের জনগণ উদারতার পরিচয় দিয়েছিল, পালিয়ে যাওয়ার সময় কাউকে বাধা দেওয়া হয়নি। কিন্তু আবার দেশে হত্যাযজ্ঞ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে আর কোনো ক্ষমা করা হবে না।’

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা সুসংহত হয়েছিল। শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সুযোগের ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামীও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসে। অথচ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনটি জামায়াতে ইসলামী যথাযথভাবে পালন করেনি।’


ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

ই-মেইল: kolom24news@gmail.com