_copy7.webp)
৩০ বছর আগে হত্যাকাণ্ডে দোষী সাব্যস্ত ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথ আরও পরিষ্কার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির গভর্নর বিল লি সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তার প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তা কার্যকর হলে গত ২০০ বছরের মধ্যে টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে পাইকের।
বর্তমানে ৫০ বছর বয়সী পাইক ১৯৯৫ সালে যখন হত্যাকাণ্ডটি ঘটান, তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর। সে সময় তার প্রেমিকের বয়স ছিল ১৭। তারা দুজন মিলে নক্সভিল জব কর্পসে তাদের সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা, জড়িতদের বয়স এবং নিহতের শরীরে শয়তানপূজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতীক খোদাই করার কারণে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
১৯৯৬ সালে পাইককে প্রথম ডিগ্রির হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে কম বয়সী ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে তার শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার ইতিহাস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের নানা সমস্যার বিষয় সামনে আসে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ঘনিয়ে আসার পর আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠন জনসাধারণকে গভর্নরের কার্যালয়ে যোগাযোগ করে পাইকের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করার আহ্বান জানায়। তবে গভর্নর লি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করতে রাজি হননি।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ক্রিস্টা গেইল পাইকের প্রাণভিক্ষার আবেদন বিবেচনা এবং মামলাটি বিস্তারিত পর্যালোচনার পর তিনি টেনেসি অঙ্গরাজ্যের দেওয়া সাজা বহাল রাখছেন এবং এতে হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা তার নেই। গভর্নরের সিদ্ধান্তে পাইকের আইনজীবীরা গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, ১৮ বছর বয়সী একজন ব্যক্তি—বিশেষ করে গুরুতর মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা কেউ; তার অপরাধের জন্য কতটা দায় বহন করতে সক্ষম, সে বিষয়ে গত কয়েক দশকের গবেষণাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে আইনজীবীরা বলেন, শৈশবজুড়ে ক্রিস্টা এমন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় যত্ন ও সহায়তা পাননি, যারা তাকে সুরক্ষা ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দিতে পারত। তাদের ভাষ্য, গুরুতর মানসিক অসুস্থতা ও গভীর মানসিক আঘাতে ভোগা সেই ১৮ বছর বয়সী তরুণী আর নেই। এখন ক্রিস্টা ৫০ বছর বয়সী একজন অনুতপ্ত নারী, যিনি নিজের কর্মকাণ্ডের পরিণতি বোঝেন, মানসিক অসুস্থতার যথাযথ চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কারাগারে থাকা অন্য নারীদের সহায়তা ও দিকনির্দেশনা দেন। পাইকের আইনজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের কাছেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রাখার আবেদন করেছেন।
সহকারী ফেডারেল ডিফেন্ডার স্টিফেন ফেরেল জানান, পাইক শৈশবের একেবারে শুরু থেকেই যৌন নির্যাতনের শিকার হন। ১১ ও ১৭ বছর বয়সেও তাকে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছিল বলে জানান তিনি। ফেরেলের দাবি, বিচার চলাকালে সাজা নির্ধারণের পর্যায়ে পাইকের আইনজীবীরা তার অতীতের এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জুরিদের সামনে উপস্থাপন করেননি। একই সঙ্গে অপরাধের সময় তার বয়সও বিবেচনায় নেওয়ার যুক্তি দেওয়া হয়নি।
স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় নিজের ভূমিকা কখনো অস্বীকার করেননি পাইক। পরবর্তী সময়ে তার বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) শনাক্ত হয়। প্রাণভিক্ষার আবেদনের সঙ্গে দেওয়া এক বিবৃতিতে পাইক বলেন, তিনি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছর বয়সী এক কিশোরী ছিলেন। নিজের কাজের ভয়াবহতা বুঝতে তার বহু বছর লেগেছে। তার কর্মকাণ্ডে কত মানুষের জীবন প্রভাবিত হয়েছে, সেটিও বুঝতে আরও সময় লেগেছে। তিনি বলেন, তিনি কারও সন্তান, বোন ও বন্ধুর জীবন কেড়ে নিয়েছেন—এ কথা এখন ভাবলেও তার নিজের কাছে তা অসহনীয় মনে হয়।
ফেরেল বলেন, কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পর্কে বর্তমানে আরও অনেক তথ্য জানা গেছে। তার মতে, পাইকের মৃত্যুদণ্ড এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী। তিনি উল্লেখ করেন, পাইকের প্রেমিক তাদারিল শিপের বয়স তখন ১৭ বছর হওয়ায় তাকে প্যারোলের সুযোগসহ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। গত বছর তার প্যারোলের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। এ ছাড়া আরেক কিশোর হত্যাকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছিল এবং তাকে প্রবেশনে রাখা হয়।
নিহত কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, তার মেয়ে স্পেশাল অলিম্পিকসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করত, রোলার স্কেটিং ভালোবাসত এবং কম্পিউটার নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছিল। মার্টিনেজ বলেন, তার মেয়ে খুবই শান্ত স্বভাবের ছিল এবং কম্পিউটারের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি ও তার স্বামী প্রায়ই মেয়ের সঙ্গে কম্পিউটার তৈরি ও খুলে দেখতেন। সবার ওপর বিশ্বাস রাখার বিষয়টিই শেষ পর্যন্ত তার জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে জানান তিনি। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, টেনেসিতে সর্বশেষ কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৮২০ সালে। মার্টিন ইভ নামের ওই নারীকে হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।
এদিকে ২০২৩ সালে মিসৌরিতে অ্যাম্বার ম্যাকলাফলিন নামে এক ট্রান্সজেন্ডার নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০০৩ সালের একটি হত্যাকাণ্ডে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ট্রান্সজেন্ডার নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকার লিসা মন্টগোমেরির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। প্রায় সাত দশকের মধ্যে সেটিই ছিল দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো নারী বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রথম ঘটনা। ২০১৫ সালে জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যেও এক নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
সূত্র: গার্ডিয়ান
বিশ্ব নিয়ে আরও পড়ুন




সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।