
আজকের এই পবিত্র দিনে ও পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা নববর্ষের সূচনালগ্নে প্রকৃতি যেমন পুরোনো জীর্ণতাকে ঝেড়ে ফেলে নতুন রূপে সাজে, তেমনি মানুষের মনেও জাগে নতুন আশার আলো। পুরোনো বছরের সব দুঃখ-কষ্ট, গ্লানি, রোগ-শোক ও হতাশা মুছে গিয়ে নতুন বছরটি হোক মানবিকতার, সহমর্মিতার এবং শান্তিময় এক নতুন অধ্যায়—এটাই আজ আমাদের সকলের একান্ত চাওয়া।
সমাজের প্রতিটি মানুষ যেন পারস্পরিক বৈষম্য ও বিভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। আর এই পবিত্র আকুতি ও গভীর ভক্তি নিয়েই শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলা সদরের পশ্চিমপাড়ায় অবস্থিত শ্রী শ্রী মহামায়া গাছতলা-এর বেদীতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অগণিত ভক্ত ও পুণ্যার্থী। মা মহামায়ার চরণে সকলের একটাই প্রার্থনা—তিনি যেন সবার জীবনে অপার শান্তি, সুস্থতা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করেন।
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রাচীন ঐতিহ্যে ভরপুর এক সমৃদ্ধ জনপদ। আর এই জনপদের মানুষের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এক পরম শ্রদ্ধার কেন্দ্রবিন্দু হলো এই মহামায়া গাছতলা। এর ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন, রহস্য ও লোককথায় ঘেরা। ইতিহাস সংগ্রাহক ও স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এই পবিত্র স্থানটির বয়স চারশত বছরেরও বেশি।
জানা যায়, সুপরিচিত তান্ত্রিক সাধক গগন চন্দ্র মোদকের পূর্বপুরুষগণ এখানে সর্বপ্রথম পূজার প্রচলন করেছিলেন। পরবর্তীতে নরেন্দ্র চন্দ্র বণিক, রাম দয়াল ঘোষ, হীরা লাল সাহার মতো একনিষ্ঠ ভক্তপ্রাণ ব্যক্তিবর্গের ঐকান্তিক তত্ত্বাবধানে এই পূজার ব্যাপক প্রসার ঘটে। একসময় এখানে একটি বিশালাকার কাঠালি বট গাছ ছিল, যা কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেলেও বর্তমানে ঠিক সেই স্থানেই একটি সুবিশাল অশ্বত্থ বট গাছ পরম মমতায় তার ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রগাঢ় বিশ্বাস, এই সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের মাঝেই আদ্যাশক্তি শ্রী শ্রী মা মহামায়া স্বয়ং অধিষ্ঠিত আছেন।
হিন্দু ধর্মীয় দর্শন ও শ্রী শ্রী চণ্ডী গ্রন্থের বর্ণনানুসারে, মহামায়া হলেন পরমেশ্বরী মহাশক্তি। তিনি অঘটন-ঘটন-পটীয়সী ব্রহ্মাত্মিকা শক্তি। এই মহাশক্তির কল্যাণেই জগত সংসারের সৃষ্টি, পালন ও সংহার সাধিত হয়। তিনিই দশভুজা দুর্গা, তিনিই শক্তিরূপিণী কালী, তিনিই জগদ্ধাত্রী রূপে যুগে যুগে ভক্তদের পূজায় তুষ্ট হন। কটিয়াদীর এই পুণ্যভূমিতে মা মহামায়া যেন তাঁর সন্তানদের পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে সাধারণ মানুষ তাই ছুটে আসে তাঁরই স্নিগ্ধ আশ্রয়ে।
মা মহামায়ার কাছে মানুষ মূলত জীবনের সহজ কিন্তু অত্যন্ত গভীর চাওয়াগুলো নিয়েই মানত করে। কেউ আসেন দীর্ঘদিনের জটিল ও দুরারোগ্য অসুস্থতা থেকে মুক্তির আশায়, কেউবা সংসারের অভাব-অনটন দূর করে একটু সুখ ও শান্তির খোঁজে। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ, শিক্ষাজীবনে সাফল্য, ভালো চাকরি, কিংবা উপযুক্ত পাত্র-পাত্রীর সাথে সুন্দর একটি বিয়ের প্রার্থনায় মায়ের বেদীতলায় ভক্তিভরে মাথা ঠেকান অসংখ্য মানুষ। মানুষের এই চাওয়াগুলোর মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল মায়ের প্রতি নিখাদ ভক্তি ও অগাধ ভরসা। এলাকার এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী রীতি আছে যা শুনলে মন জুড়িয়ে যায়। যেমন, বিবাহের পর নবদম্পতি নতুন জীবনে পদার্পণ করে নিজেদের বাড়িতে ওঠার আগেই এই মহামায়া গাছতলায় ছুটে আসেন মায়ের আশীর্বাদ নিতে। আবার পরিবারের নতুন অতিথিদের, অর্থাৎ ছোট শিশুদের অন্নপ্রাশন-এর মতো জীবনের প্রথম অন্নগ্রহণের পবিত্র আনুষ্ঠানিকতাটিও অনেকে এখানেই অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন করেন। ইচ্ছা পূরণ হলে কৃতজ্ঞতা জানাতেও মায়ের স্মরণাপন্ন হন ভক্তরা—এই বিশ্বাসই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি।
সারা বছর ধরেই মহামায়া গাছতলায় নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হয়। প্রতি অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে ভক্তরা এখানে নিয়মিত প্রদীপ প্রজ্বলন করে মনের অন্ধকার দূর করার প্রার্থনা করেন। এছাড়া কার্তিক মাসে মা মহামায়ার বেদীতে জগদ্ধাত্রী পূজা, চৈত্র সংক্রান্তিতে হরগৌরী ও শীতলা মায়ের পূজা এবং দীপাবলির আলোকময় রাতে কালী পূজার আয়োজন থাকে। তবে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে এই মহামায়া গাছতলা যেন এক অপূর্ব ও স্বর্গীয় রূপে সেজে ওঠে।
নববর্ষের শুভলগ্নে সকাল থেকেই ধূপ-ধুনোর সুগন্ধ, কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ও শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। এদিন মায়ের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ও মানত পূরণের অংশ হিসেবে ভক্তরা শত শত রঙিন নতুন শাড়ি দিয়ে ঐতিহাসিক বটবৃক্ষটিকে পরম যত্নে আচ্ছাদিত করেন। দেবীর কৃপা লাভের আশায় এবং মানত হিসেবে পুণ্যার্থীরা এখানে পাঁঠা ও কবুতর উৎসর্গ বা বলীদান করেন, যা এখানকার শত শত বছরের এক সুপ্রাচীন প্রথা। প্রতি বছর নববর্ষে এই স্থানে অগণিত ভক্তের উপস্থিতিতে বলীদান সম্পন্ন হয়, যা মানুষের ধর্মীয় আবেগের একটি বড় অংশ।
নববর্ষের এই উৎসব কেবল ধর্মীয় পূজার্চনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি রূপ নেয় এক সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায়। গাছতলার বেদীকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মৃৎশিল্পীদের নিপুণ হাতের তৈরি মাটির হাঁড়ি-পাতিল, বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র, শিশুদের রংবেরঙের খেলনা থেকে শুরু করে নানা রকম মিষ্টি, জিলাপি ও মুখরোচক খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে আশপাশের সব বয়সের মানুষ নতুন জামাকাপড় পরে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা উপভোগ করতে আসেন। উৎসবের এই উচ্ছল আমেজ ছড়িয়ে পড়ে কটিয়াদীর প্রতিটি ঘরে ঘরে। মেলা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং বিশেষ করে মেয়ে-জামাইদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঘরে ঘরে আনন্দের সাথে তৈরি হয় খই, মুড়কি, নারকেল আর খাঁটি দুধের নাড়ু। এক অভাবনীয় আনন্দ, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ঐকতানে আবদ্ধ হয় পুরো অঞ্চল।
শত বছরের এই গৌরবময় ঐতিহ্য আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বিশ্বাসের শিকড় কত গভীরে প্রোথিত হতে পারে। মহামায়া গাছতলা কেবল একটি ধর্মীয় তীর্থস্থান নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ঐকান্তিক ভক্তি ও স্থানীয় লোকাচার সংস্কৃতির এক জীবন্ত ও জাগ্রত প্রতীক। মায়ের বেদীতে প্রজ্জ্বলিত প্রতিটি মাটির প্রদীপের কম্পমান শিখা যেন একেকটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা ও প্রার্থনার উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
মায়ের অসীম কৃপায় সবার ভক্তিপূর্ণ মনোবাসনা ও অন্তরের আকুতি পূর্ণ হোক। নতুন বছর সবার জন্য বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ, সুস্বাস্থ্য, পরম শান্তি ও সমৃদ্ধি। পুরোনো বছরের সব না পাওয়া ও গ্লানি ভুলে আমরা যেন সত্য, সুন্দর ও মানবিকতায় পরিপূর্ণ এক বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে পারি, মায়ের শ্রী চরণে আজ এটাই আমাদের মূল প্রার্থনা। জয় মা মহামায়া।
সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান
নূর জাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।