

আজ ২৬ জুন। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো সাধারণ, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি এক বেদনাবিধুর স্মৃতির দিন। আজ কিংবদন্তি সাংবাদিক, লেখক এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা এম আর আখতার মুকুলের ২২তম প্রয়াণ দিবস। ২০০৪ সালের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কণ্ঠস্বর আজও আমাদের জাতীয় স্মৃতির পাতায় প্রকম্পিত হয়।
১৯৭১ সালের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধ কেবল আগ্নেয়াস্ত্রের লড়াই ছিল না; এটি ছিল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক তীব্র লড়াই। সেই ক্রান্তিলগ্নে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখতে এবং হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ পালন করেছিল অবিস্মরণীয় ভূমিকা। আর সেই কেন্দ্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী অনুষ্ঠান ছিল ‘চরমপত্র’।
পাক বাহিনীর নৃশংসতা আর তাদের দম্ভের বিপরীতে এম আর আখতার মুকুলের ক্ষুরধার লেখনী ও হাস্যরসাত্মক অথচ শ্লেষাত্মক উপস্থাপনা ছিল অনন্য। তিনি ঢাকাইয়া কুটি আঞ্চলিক ভাষায় যেভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে চুরমার করে দিতেন, তা সাধারণ বাঙালিকে নতুন সাহসে বলীয়ান করেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন এক অঘোষিত সেনাপতি, যিনি কামান বা রাইফেলের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন তাঁর শব্দের জাদুতে।
“আজকের চরমপত্রের বিষয়বস্তু...” - এই বাক্যটি শোনার জন্য রণাঙ্গনের যোদ্ধা থেকে শুরু করে অবরুদ্ধ দেশের সাধারণ মানুষ অধীর অপেক্ষায় থাকতো।
এম আর আখতার মুকুল কেবল একজন কণ্ঠশিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন নিভৃতচারী কলমসৈনিক। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এবং সাহিত্য অঙ্গনেও তিনি তাঁর মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন বই ও নিবন্ধে আমরা পাই এক নির্ভীক লেখকের প্রতিচ্ছবি, যিনি মিথ্যার বিরুদ্ধে চিরকাল মাথা উঁচু করে লড়াই করেছেন। ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান তৈরিতে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে পাথেয় হয়ে থাকবে।
এম আর আখতার মুকুল আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, দেশের প্রয়োজনে কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে থাকাই একমাত্র দেশপ্রেম নয়। কলম, কণ্ঠ বা যে কোনো সৃজনশীল মাধ্যম দিয়েও দেশের সেবা করা সম্ভব। তাঁর প্রয়াণ দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা উপলব্ধি করি, তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের লেখক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ‘চরমপত্র’ আমাদের শেখায় কীভাবে কঠিন সময়েও হাস্যরসের মাধ্যমে শত্রুকে পরাস্ত করা যায় এবং হতাশার পরিবর্তে আশার আলো ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
২২ বছর আগে এম আর আখতার মুকুল দেহত্যাগ করেছেন ঠিকই, কিন্তু যে চেতনা তিনি মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা আজো অমলিন। আজকের দিনে তাঁর প্রতি জানাই গভীর বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি শৌর্যের গানে।
বাঙালির ইতিহাসে এম আর আখতার মুকুল নামটির কোনো ক্ষয় নেই, কারণ তিনি নিজেই হয়ে আছেন এক অমর ইতিহাস।
সম্পাদকীয় ও মতামত নিয়ে আরও পড়ুন





সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
নূর জাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।