প্রতিবেদক: কলম২৪ প্রতিবেদক

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার (তদানীন্তন মহকুমা) বৈদ্যনাথ তলার(বর্তমানে মুজিবনগর) আম্রকাননে এই অস্তমিত সূর্য পুনরায় উদিত হয়। মাঝে ব্রিটিশের প্রায় ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭) এবং পাকিস্তানের ২৪ বছর (১৯৪৭-১৯৭১) ছিল পূর্ববাঙালির জীবনের শোষণ, বঞ্চন ও নিষ্পেষণের এক সুদীর্ঘ বেদনার সকরুণ ইতিহাস।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কালজয়ী নেতৃত্বের ছন্দময় ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হলে ১৯৭১ এর ১০ এপ্রিল ঐ একই স্থানে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে চার জাতীয় নেতার ঐতিহাসিক নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্মের সনদ হিসেবে 'স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ঘোষণাপত্র' তাবৎ বিশ্বের উদ্দেশ্যে উপস্থাপন করা হয়। ঐ একই দিনে অন্তরীন বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপ্রধান এবং তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম কে উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকার গঠন করা হয়। তখন (মুক্তিযুদ্ধকালীন) পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নির্মম রোষানল এড়িয়ে ১৭ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী এবং এম এ জি ওসমানী কে সেনাপ্রধান ঘোষনা করে ১২৭ জন দেশি-বিদেশি সাংবাদিকের উপস্থিতিতে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সর্বভৌম বাংলাদেশের পক্ষে অনুষ্ঠানিক সরকারের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই সরকারের নামকরণ করা হয় 'মুজিবনগর সরকার'।
চলমান মুক্তিযুদ্ধকে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করে বিশ্ব দরবারের সমর্থন ঘুরিয়ে দিতে না পারে সেজন্যই এই অস্থায়ী সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন করে একটি প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা সহ বহির্বিশ্বের সমর্থন ও সাহায্য আদায়ে ইতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ অত্যন্ত বিচক্ষণী ও দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তার ফসল হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়ন ও এটার প্রতিফলন স্বরূপ এই সরকার গঠিত হয়। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম যে শতভাগই যৌক্তিক ছিল তা ঘোষণাপত্রের ( proclaimation of independence) প্রতিটি অক্ষরে প্রতিফলিত ও প্রতিভাত হয়েছে। এটাকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানও বলা হয়।
১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর নতুন সংবিধান প্রণীত হলে এটার সাংবিধানিক কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে মূল সংবিধানের সপ্তম তফসীলে এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্রটি সংযোজিত হয়। সমসাময়িক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিম্নে ঘোষণাপত্রটির কিছু চুম্বক অনুচ্ছেদ তুলে ধরা হলো : " যেহেতু ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর হইতে ১৯৭১ সনের ১৭ই জনুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত করা হইয়াছিল এবং "যেহেতু এ নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামীলীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়াছিলেন" এবং " যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩ রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন" এবং" যেহেতু আহূত এই পরিষদ স্বেচ্ছায় এবং বে-আইনীভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাহাদের প্রতিশ্রুতি পালন করিবার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সহিত পারস্পরিক আলোচনা কালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখন্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান" এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করিয়াছে এবং এখনো বাংলাদেশে র বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাইতেছে এবং "যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্যা ও নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের একত্রিত হইয়া শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করিয়া জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে" এবং" যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাহাদের বীরত্ব ও সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাহাদের কার্যকরী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিয়াছে।
সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়াছেন সেই ম্যানডেট মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের ক্ষমতায় গণপরিষদ গঠন করিয়া পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য সেইহেতু আমরা বাংলাদেশকে রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করিতেছি। এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করিতেছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্র প্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকিবেন।"
মহান চার জাতীয় নেতার এমন বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা কালের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। বৈদ্যনাথ তলার মুজিবনগর সেই কালের সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে। গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চিহ্নিত গোষ্ঠী সেখানকার ঐতিহাসিক স্মৃতিস্মারক গুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়ে তা ধুলিস্যাৎ করার অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু ইতিহাস কে কখনো ধূলিসাৎ করা যায় না; বরং করতে গেলে তা বজ্রগরজে ফুঁসে ওঠে। এটাই ইতিহাসের অবিনাশী প্রকৃতি। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক জেট ফোর্সের লড়াকু কমান্ডার ও বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষক- বীরোত্তম শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরম দেশাত্মবোধের চেতনায় সৃষ্টি। এই বিএনপি সর্বশেষ ত্রয়োদশ নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের জিগির তুলেই নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। অথচ, ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল ১৭ এপ্রিলের ঐতিহাসিক এই বিশেষ দিনদু'টি বিএনপি ও তার সরকার সাংগঠনিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করেনি যা নিশ্চয়ই লাখো শহিদের আত্মাকে গভীর ভাবে বেদনার্ত করে তুলেছে!তারা কী এই আর্তনাদ শুনতে পায়?
কাজী মাসুদুর রহমান
লেখক: কলামিস্ট।
সম্পাদকীয় ও মতামত নিয়ে আরও পড়ুন





সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : এনামুল হক আরমান
নূর জাহান রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।