

বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ৭ই জুন একটি অনন্য, ভাস্বর এবং অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৬৬ সালের এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ‘৬ দফা’ দাবির সমর্থনে সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়েছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম নির্যাতন, দমন-পীড়ন এবং বুলেটের আঘাতকে উপেক্ষা করে রাজপথে নেমে এসেছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার আপামর জনতা। ৭ই জুনের সেই রক্তঝরা পথ ধরেই মূলত রচিত হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত মহাকাব্য।
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক—সব ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। শাসকগোষ্ঠীর চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রথম বড় আঘাত ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। এরপর ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। তখন বাঙালিরা তীব্রভাবে উপলব্ধি করে যে, পিন্ডির শাসকরা কেবল এই অঞ্চলের সম্পদ শোষণ করতেই ব্যস্ত, এর নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন।
এই চরম বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার পটভূমিতে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ‘৬ দফা দাবি’ পেশ করেন। এই ৬ দফা ছিল মূলত বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির এক নিখুঁত সনদ, যাকে পরবর্তীতে 'বাঙালির ম্যাগনাকার্টা' বা মুক্তি সনদ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
বাঙালির বাঁচার দাবি হিসেবে উত্থাপিত সেই ঐতিহাসিক ৬ দফা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে গড়তে হবে। এতে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হতে হবে।
২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দুটি বিষয়—প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র বিষয়। বাকি সব বিষয় অঙ্গরাজ্য বা প্রদেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
৩. মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: দুই অঞ্চলের জন্য সহজে বিনিময়যোগ্য দুটি পৃথক কিন্তু সংহতিপূর্ণ মুদ্রা থাকবে; অথবা সমগ্র দেশের জন্য একটিই মুদ্রা থাকবে, তবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার রোধে সংবিধানে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি পৃথক রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।
৪. রাজস্ব, কর ও শুল্ক বিষয়ক ক্ষমতা: কর, রাজস্ব ও শুল্ক ধার্য এবং আদায়ের সমস্ত ক্ষমতা থাকবে অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের এ ধরনের কোনো ক্ষমতা থাকবে না। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য আদায়কৃত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা হবে।
৫. বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নিজ নিজ রাজ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা রাজ্যগুলো সমান হারে বা চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করবে।
৬. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য নিজস্ব আধাসামরিক বাহিনী বা মিলিশিয়া (যেমন: প্যারামিলিটারি ফোর্স) গঠনের ক্ষমতা দিতে হবে।
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত এই ৬ দফা আন্দোলনের গতি স্তব্ধ করতে তৎকালীন সামরিক জান্তা আইয়ুব খান দমন নীতি গ্রহণ করে। বঙ্গবন্ধুসহ শীর্ষস্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের একের পর এক গ্রেপ্তার করা হয়। নেতার অনুপস্থিতিতে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ৭ই জুন সমগ্র পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক হরতালের ডাক দেওয়া হয়।
সেই হরতাল কেবল সাধারণ কোনো প্রতিবাদ ছিল না, তা ছিল শোষণের বিরুদ্ধে এক গণবিস্ফোরণ। তেজগাঁও, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বীর বাঙালি শহীদ হন। হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে "ছয় দফা কায়েম করো", "সোচ্চার বাঙালির সাহসের উৎস মুক্তির প্রেরণা" স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ। রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলার মাটি, আর সেই রক্তই বাঙালির হৃদয়ে জ্বেলে দেয় স্বাধীনতার অবিনাশী শিখা।
৭ই জুনের সফল হরতাল এবং ৬ দফা আন্দোলনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী:
জাতীয়তাবোধের উন্মেষ: ৬ দফা কেবল স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না, এটি বাঙালি জাতিকে এক সুতোয় গেঁথেছিল এবং তাদের মধ্যে তীব্র জাতীয়তাবোধের জন্ম দিয়েছিল।
নেতা থেকে 'বঙ্গবন্ধু': এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন তৎকালীন সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, যার ধারাবাহিকতায় তিনি পরবর্তীতে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত হন।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ৭০-এর নির্বাচন: ৬ দফার ওপর ভর করেই রচিত হয়েছিল ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। আর এরই চূড়ান্ত ফসল ছিল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ।
৭ই জুন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের মহিমা। ৬ দফার ভেতরেই নিহিত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের বীজ। এই আন্দোলনের রক্ত সিঁড়ি বেয়েই আমরা পেয়েছি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের লাল-সবুজের স্বাধীন পতাকা।
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক এই দিবসের চেতনা আমাদের দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমেই কেবল ৭ই জুনের শহীদদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
সম্পাদকীয় ও মতামত নিয়ে আরও পড়ুন





সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।