

আজ ১৩ জুন। ২০২০ সালের এই দিনে মহামারি করোনার প্রকোপের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মোহাম্মদ নাসিম। আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি কেবল একজন সফল মন্ত্রী বা সাংসদই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কঠিন সময়ের এক অকুতোভয় কাণ্ডারি এবং ১৪ দলীয় জোটের ঐক্যের প্রতীক।
মোহাম্মদ নাসিমের চিরবিদায়ের এই দিনে তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দেশের প্রতি তাঁর অবদানকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে বাঙালি জাতি।
১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুরে জন্ম নেন মোহাম্মদ নাসিম। তাঁর ধমনিতে বইছিল রাজনীতির রক্ত। তাঁর পিতা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহচর, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন এম মনসুর আলী।
পিতার এই আদর্শ এবং নির্মম হত্যাকাণ্ড মোহাম্মদ নাসিমকে ছাত্রজীবন থেকেই এক আপসহীন রাজনীতিবিদে পরিণত করে। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়)—সবখানেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বুকে ধারণ করে রাজনীতি করে গেছেন।
মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক জীবন কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন আওয়ামী লীগ চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন দলকে সুসংগঠিত করতে তিনি রাজপথে নেমে আসেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারবিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে তিনি সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বহুবার কারাবরণ করেছেন, নির্মম পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু কোনো ভয়ভীতি বা প্রলোভন তাঁকে আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে শুরু করে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে এক নিবিড় বন্ধন তৈরি করেছিলেন। মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন এক পরম আশ্রয়ের নাম।
মোহাম্মদ নাসিম কেবল রাজপথেরই নেতা ছিলেন না, রাষ্ট্র পরিচালনায়ও তিনি তাঁর মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি মোট ৬ বার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ এবং ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৬ থেকে ২০০১–স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ভূমিকা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সূচনা হয়।
২০১৪ থেকে ২০১৯–স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী ছিলেন। তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে 'কমিউনিটি ক্লিনিক' প্রকল্পের বিস্তার, চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন করেন।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর মেয়াদে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আন্তর্জাতিকভাবে বেশ কিছু স্বীকৃতি অর্জন করে। চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ মানুষের দোড়গোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিনিয়ত মাঠপর্যায় পরিদর্শন করতেন।
মোহাম্মদ নাসিমের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর মোর্চা '১৪ দল'-এর মুখপাত্র হিসেবে তাঁর ভূমিকা। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে রাখা এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেই ঐক্য ধরে রাখার পেছনে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ধৈর্য ছিল প্রশংসনীয়। তিনি সংকটের সময়েও সব দলের নেতাদের সাথে সমন্বয় করে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতেন। তাঁর অকাল প্রয়াণের পর ১৪ দলের সেই চাঙ্গাভাবে যে বড় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও দৃশ্যমান।
"রাজনীতি কোনো ড্রয়িংরুমের বিষয় নয়, রাজনীতি হলো মানুষের কল্যাণের জন্য রাজপথে থাকা।"
— মোহাম্মদ নাসিম
মোহাম্মদ নাসিম এমন এক সময়ে চলে গেছেন যখন বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব চলছিল। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার তাগিদেই তিনি মহামারির মধ্যেও মাঠে ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজেই এই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করার এই মানসিকতাই প্রমাণ করে তিনি কতটা জনমুখী নেতা ছিলেন।
আজ তাঁর প্রয়াণের ছয় বছর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর মতো একজন কর্মীবান্ধব, চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে পারা এবং ক্রান্তিকালের সাহসী নেতার অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। মোহাম্মদ নাসিম তাঁর কর্ম, আদর্শ এবং আপসহীন রাজনীতির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।
এই মহান নেতার ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
সম্পাদকীয় ও মতামত নিয়ে আরও পড়ুন





সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।
স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।