home icon
Login

অনুসরণ করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on

Google Play

Download on the

App Store


রেভলিউশন তৈরি করা আর রেভলিউশন জেগে ওঠা এক নয়: গুলশানের মিছিল তার প্রমাণ

দীপান্বিতা মার্টিন
দীপান্বিতা মার্টিনকলম২৪.কম

আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:১৮

Facebook
Twitter

রেভলিউশন তৈরি করা আর রেভলিউশন জেগে ওঠা এক নয়: গুলশানের মিছিল তার প্রমাণ

রেভলিউশন তৈরি করা আর রেভলিউশন জেগে ওঠা—দুই ভিন্ন বিষয়। একটি পরিকল্পনা করে তৈরি করা যায়, মানুষের আবেগকে কোনো নির্দিষ্ট দিকে প্রবাহিত করা যায়; কিন্তু মানুষের ভেতর থেকে যে রেভলিউশন জেগে ওঠে, তাকে কি আর মঞ্চস্থ করতে হয়?


আজ গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল যেন সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে নিয়ে এলো। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রতিবাদে হওয়া এই মিছিলকে শুধু একটি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো ছবিটা দেখা হবে না। এত ভয়াবহ নির্যাতন, ভয়, মামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষ যদি সাহস নিয়ে এত বড় মিছিলে রাস্তায় নামে, তাহলে এর ভেতরে মানুষের সম্পৃক্ততার কোনো বার্তা নেই—এ কথা কি বলা যায়?


আজ গুলশান যেন প্রশ্ন তুলেছে—মানুষ আসলে কী চাইছে? গত দু’বছরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে অনেক। বাংলাদেশের শত শত কারখানা বন্ধ হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি, কর্মসংস্থানের অভাব, দ্রব্যমূল্যের চাপ—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে।


এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—তাহলে কি মানুষ আবারও আওয়ামী লীগকেই সরকার হিসেবে চাইছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আজই দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখে যে কথাগুলো শোনা যায়, সেগুলোও কি উপেক্ষা করা যায়?


গরিব মানুষের কেউ কেউ বলেন—শেখ হাসিনা স্বৈরাচার হোক আর যা-ই হোক, তাঁর শাসনামলে তাঁদের কাজ ছিল, ভাতা ছিল, বিদ্যুৎ ছিল।


একজন রাজনৈতিক সচেতন মানুষ হয়তো এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু একজন দরিদ্র মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতাকে কি শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অস্বীকার করা যায়?


মানুষের কাছে গণতন্ত্র যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার পেটের ভাত, কাজ, বিদ্যুৎ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পরিবারের ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ। আর এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়ায়—মানুষ কি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়, নাকি এমন পরিবর্তন চায় যা তার জীবনের বাস্তবতাকেও বদলে দেবে?


অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ঘটনাকে আমরা কীভাবে ইতিহাসে লিখব—সেই প্রশ্নও আজ নতুন করে সামনে এসেছে। সাবেক আইন উপদেষ্টার বক্তব্য হিসেবে যদি সত্যিই বলা হয়ে থাকে যে তিনি ২০২৪ সালে কোনো ‘গণঅভ্যুত্থান’ দেখেননি, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—তাহলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের কোটা আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া সেই বিস্ফোরক জনসম্পৃক্ততার ঘটনাকে আমরা কী নামে অভিহিত করব?


সেটি কি শুধু একটি কোটা আন্দোলন ছিল? নাকি সেটি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল? নাকি ২০২৪ সালের ঘটনাকে আমরা আজও সম্পূর্ণভাবে বুঝে উঠতে পারিনি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিহাসই হয়তো একদিন দেবে।


কিন্তু আজকের গুলশানের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ এবং সেখানে তৈরি হওয়া গণতরঙ্গ আমাদের আবারও ভাবতে বাধ্য করছে—২০২৪ সালে যে পরিবর্তন আমরা দেখেছি, সেটি কি সত্যিই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ ছিল?


নাকি মানুষের আবেগকে অন্য কোনো শক্তি ব্যবহার করেছিল? ডলারের মাধ্যমে মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে একটি ‘মেটিকুলাস রেভলিউশন’-এর নাটিকা তৈরি হয়েছিল—এমন প্রশ্নও আজ কেউ কেউ তুলছেন।


এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। এর উত্তরও ইতিহাস ও ভবিষ্যতের গবেষণাই হয়তো দেবে। কিন্তু আজকের গুলশান অন্তত একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—মানুষের ভেতরে কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা সত্যিই জেগে উঠলে সেটিকে সবসময় বাইরে থেকে তৈরি করে দিতে হয় না। 


*মানুষ নিজেই জেগে উঠতে পারে


রেভলিউশন মঞ্চে তৈরি করা যায়, স্লোগান তৈরি করা যায়, প্রচারণা তৈরি করা যায়; কিন্তু মানুষের হৃদয়ের গভীরে জন্ম নেওয়া রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কি বাইরে থেকে তৈরি করা সম্ভব?


আজকের গুলশান যেন সেই পার্থক্যটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। আওয়ামী লীগের ছয়শরও বেশি নেতা দেশের বাইরে এবং হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মী জেলে বা নানা মামলার মুখোমুখি—এমন একটি কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও যদি গুলশানের রাস্তায় মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে জেগে ওঠে, তাহলে সেই দৃশ্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে।


*কিন্তু সেই তাৎপর্যের অর্থ কী?


এটি কি আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের পুনরায় সমর্থনের ইঙ্গিত? নাকি এটি নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ? নাকি এটি মানুষের নিজের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করার অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা? নাকি এর চেয়েও বড় কোনো পরিবর্তনের পূর্বাভাস?


আমরা কোনো একটি উত্তর এখনই চাপিয়ে দিতে পারি না। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—মানুষের মতামত একরকম নয়। কেউ শেখ হাসিনার শাসনকে স্বৈরাচার হিসেবে দেখেন। কেউ তাঁর সময়ের কাজ, ভাতা, বিদ্যুৎ বা সামাজিক নিরাপত্তার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। কেউ ২০২৪-কে গণঅভ্যুত্থান বলেন, কেউ বলেন এটি ছিল ছাত্রদের কোটা আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বিস্ফোরণ। কেউ পরিবর্তনকে মুক্তি হিসেবে দেখেন, আবার কেউ পরিবর্তনের পরবর্তী বাস্তবতায় নিজেদের জীবনে নতুন সংকট অনুভব করেন।


*সব কণ্ঠই বাংলাদেশের গল্পের অংশ


তাই আজকের গুলশানের মিছিলকে শুধু একটি দলের শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখা যেমন যথেষ্ট নয়, তেমনি এটিকে পুরো বাংলাদেশের মানুষের রায় বলাও ঠিক হবে না। তবে এটুকু বলা যায়—মানুষের রাজনৈতিক আবেগকে চিরদিন দমিয়ে রাখা যায় না।


ভয় হয়তো মানুষকে কিছুদিন নীরব রাখতে পারে। মামলা মানুষকে কিছুদিন ঘরে আটকে রাখতে পারে। রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা একটি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম থামিয়ে দিতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে কি নিষিদ্ধ করা যায়?


আজকের গুলশানের গণতরঙ্গ হয়তো সেই প্রশ্নই আমাদের সামনে এনে দিয়েছে। কারণ রেভলিউশন কেবল কোনো একটি দিনের ঘটনা নয়। রেভলিউশন মানুষের মনে তৈরি হওয়া একটি বিশ্বাস, একটি ক্ষোভ, একটি আকাঙ্ক্ষা। সেটিকে কাগজে লেখা যায়, মঞ্চে ঘোষণা করা যায়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া যায় না।


*রেভলিউশন জেগে ওঠে—তৈরি করতে হয় না


আজকের গুলশান হয়তো কোনো চূড়ান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বার্তা দেয়নি। কিন্তু এটি একটি অস্বস্তিকর এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে গেছে—২০২৪-এর পর যে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, সেই বাংলাদেশকে কি মানুষ সত্যিই নিজের বাংলাদেশ হিসেবে গ্রহণ করেছে?


আর যদি না করে থাকে, তাহলে মানুষের সেই অস্বস্তির ভাষা কী? হয়তো সেই উত্তরই আমাদের খুঁজতে হবে।


দল দিয়ে নয়।

স্লোগান দিয়ে নয়।

প্রতিহিংসা দিয়ে নয়।


মানুষের জীবনের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির সবচেয়ে বড় বিচারক কোনো দল নয়—মানুষ।


আর আজ গুলশানের রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি অন্তত এতটুকু মনে করিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের মানুষ এখনো কথা বলতে চায়, নিজের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ করতে চায় এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নিজের হাতে রাখতে চায়।


হয়তো এটাই আজকের সবচেয়ে বড় বার্তা। হয়তো এটাই মানুষের জেগে ওঠার ইঙ্গিত। হয়তো এটাই নতুন এক গণতরঙ্গের শুরু।



অনুসরণ করুন

logologologologologo

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on

Google Play

Download on the

App Store

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)

ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।