নতুন দিগন্তের পথে বাংলাদেশ: নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সমীপে খোলা চিঠি
সুমিত বণিক
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

নতুন দিগন্তের পথে বাংলাদেশ: নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সমীপে খোলা চিঠি

এই খবরটি পড়া হয়েছে: 136 বার

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করায় এবং বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আপনাকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। দেশের এই অস্থিতিশীল ক্রান্তিকালে সাধারণ মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের যে গুরুভার আপনার কাঁধে অর্পণ করেছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বিজয় নয়—এটি কোটি কোটি প্রাণের আশা, আকাঙ্ক্ষা এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাস থেকে মুক্তির এক মহাপ্রত্যাশা। ধানের শীষ আজ কেবল একটি দলীয় প্রতীক হয়ে থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছে এ দেশের মাটি ও মানুষের উন্নয়নের এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি এক অস্থির সময় পার করছে। আমাদের প্রিয় জন্মভূমিও এর বাইরে নয়। দীর্ঘদিনের সামাজিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং অনিশ্চয়তার যে মেঘ আমাদের আকাশকে আচ্ছন্ন করেছিল, জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে সেই মেঘ সরিয়ে নতুন সূর্যের দেখা পেতে চেয়েছে। এই বিজয় আপনার প্রতি জনগণের এক বিশাল আমানত। আর এই আমানত রক্ষার প্রধান শর্ত হলো—দল, মত, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস গেঁথে দেওয়া যে, “এই সরকার সবার, এই বাংলাদেশ সবার এবং সর্বোপরি “সবার আগে বাংলাদেশ”।

বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চাওয়া একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, যেখানে নাগরিকের অধিকার কেবল সংবিধানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তার প্রতিফলন ঘটবে প্রতিটি সরকারি দপ্তরে, রাস্তায় এবং অলিগলিতে। মানুষ আজ কথা বলতে চায়, নিজের অধিকারের প্রশ্নে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। আমরা আশা করি, আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে যেখানে ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং সম্মান জানানো হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের অবারিত সুযোগই হবে একটি সবল গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।

জনগণ প্রত্যাশা করে, আইনের শাসন এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে যেখানে বিচার বিভাগ তার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করবে। সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির ভয় ছাড়াই বিচার চাইতে পারে—সেই আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা আপনার প্রথম ও প্রধান কাজ হওয়া উচিত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজকের দিনে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়। কৃষক, শ্রমিক, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ আজ দিশেহারা। ধানের শীষ যেমন মাটির গভীর থেকে খাদ্য ও পুষ্টির জোগান দেয়, আমরা প্রত্যাশা করি আপনার অর্থনৈতিক নীতিগুলো তেমনিভাবে দেশের প্রান্তিক মানুষের অন্নের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা আজ সময়ের দাবি। আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষক ও পোশাক শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় আপনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা একান্ত প্রয়োজন। উন্নয়নের সুফল যেন কেবল তিলোত্তমা শহরগুলোতে আটকে না থেকে গ্রাম বাংলার মেঠোপথ পর্যন্ত সমানভাবে পৌঁছে যায়, সেই সুষম বণ্টনের নীতি গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ।

আজকের বাংলাদেশ তারুণ্যের শক্তিতে বলীয়ান। আমাদের মেধাবী তরুণরা আজ বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু কর্মসংস্থানের অভাব এবং মানসম্মত শিক্ষার সংকট সেই স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আপনি তরুণদের স্বপ্নের প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনবেন—এটাই সবার প্রত্যাশা।

কেবল সনদসর্বস্ব শিক্ষা নয়, বরং কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক আধুনিক শিক্ষায় আমাদের সন্তানদের গড়ে তুলতে হবে। আইটি সেক্টর, ফ্রিল্যান্সিং এবং স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসারে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করতে হবে। তরুণরা যেন দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পরিবর্তে এ দেশের মাটিতেই তাদের মেধা ও শ্রম বিনিয়োগ করতে পারে, সেই কর্মমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করা আপনার অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। মেধার মূল্যায়নই হোক আগামীর বাংলাদেশের মূলমন্ত্র।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। এ দেশের মাটিতে দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসবাস করে আসছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতায় যে সামাজিক ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা নিরাময়ে আপনার বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রয়োজন।

জাতীয় ঐক্যই হোক আমাদের অগ্রযাত্রার মূল শক্তি। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও জাতীয় স্বার্থে আমরা যেন সবাই এক হতে পারি, সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা আপনার মাধ্যমেই শুরু হোক। ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্র ও দেশ যেন হয় সবার—এই নীতির বাস্তবায়ন আমাদের বিশ্বদরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশা সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ। একজন গরিব মানুষ যেন অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা না যায়, সেই মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এখন অপরিহার্য। পাশাপাশি বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনী আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে যেন প্রকৃত হকদাররা তাদের প্রাপ্য পান।

জনগণ পরিবর্তনের যে ডাক দিয়েছে, তার মূলে রয়েছে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। আপনার সরকার যদি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে, তবেই মানুষের আস্থা স্থায়ী হবে। সরকারি প্রতিটি দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তারা যেন জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন, শাসক হিসেবে নয়। সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বকে উৎসাহিত করে একটি মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

উন্নয়ন বলতে আমরা কেবল বড় বড় দালান বা রাস্তাঘাট বুঝি না। উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এই দেশে নদী রক্ষা, বনভূমি রক্ষা এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আগামী প্রজন্মের জন্য আমাদের সবচেয়ে বড় উপহার। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে আপনার নেতৃত্ব হবে আমাদের পাথেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সামনে এক বিশাল আকাশসম দায়িত্ব। আপনি এই দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন। এই বিপুল বিজয় যেমন আনন্দের, তেমনি এটি একটি বিশাল দায়বদ্ধতাও। জনগণ আপনাকে ভালোবেসে যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, তার প্রতিদান হতে পারে কেবল নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম এবং জনগণের সেবার মাধ্যমে।

আমরা বিশ্বাস করি, আপনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল মধ্যম আয়ের দেশ নয়, বরং একটি উন্নত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে। প্রতিটি নাগরিক যেখানে গর্বের সাথে বলতে পারবে—”এটি আমার দেশ, এখানে আমার অধিকার সুরক্ষিত।”

নতুন এই যাত্রায় আপনার সাফল্য কামনা করি। ইতিহাস যেন আপনাকে মনে রাখে একজন জনবান্ধব, সাহসী ও সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, যিনি ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো নতুন বাংলাদেশকে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলাদেশের এক সাধারণ নাগরিক এবং কোটি মানুষের প্রতিনিধি হয়ে

সুমিত বণিক, জনস্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশিক্ষক।

Facebook Comments Box

Comments

comments

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কুমিল্লায় ক্লাবফুট শিশুদের অভিভাবকদের সচেতনতা সভা

ঢাকা দক্ষিণ থেকে সিটি নির্বাচন করব : ইশরাক

নতুন দিগন্তের পথে বাংলাদেশ: নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সমীপে খোলা চিঠি

২১ ফেব্রুয়ারি ছিলো অন্যায়ের প্রতিবাদ : এ টি এম আজহারুল

এবার ১৫ শতাংশ শুল্কারোপের ঘোষণা ট্রাম্পের

ঈদের ছোঁয়ায় ফ্যাশন রানওয়ে: আভিজাত্য আর রঙের মিলনমেলা

‘মনের সৌন্দর্য সর্বক্ষণ থাকে’ : অনন্যা আফরিন

ট্রেন্ডি শাড়িতে র‍্যাম্প কাঁপালেন আঁখি আফরোজ

অনন্যার র‍্যাম্প পারফরম্যান্স, করতালিতে ভাসলো ‘লাভ ফ্যাশন’

যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন মির্জা আব্বাস

১০

মন্ত্রিসভার শপথের ডাক পেলেন কায়কোবাদ

১১

২০২৬-এ ম্যানেজ ভোট হয়েছে : রাশেদ প্রধান

১২

নির্বাচনের নামে আমাদের ধোঁকা দেওয়া হয়েছে : কর্নেল অলি

১৩

চারদিন পর সিলমারা ব্যালট উদ্ধার

১৪

ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা ইনকিলাব মঞ্চের জাবেরের

১৫

সাকিব-মাশরাফিকে দেওয়া গণহত্যার মামলা বিশ্বাসযোগ্য নয়: ইশরাক

১৬

পদত্যাগ করলেন আইজিপি বাহারুল

১৭

শ্রদ্ধা নিবেদনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ঢাবি শিক্ষক, হট্টগোল

১৮

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হতে পারেন ফজলুর রহমান!

১৯

হাওরের মানুষের মন বড়: জামায়াতে আমীর

২০