home icon
Login

অনুসরণ করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on

Google Play

Download on the

App Store


রেমিট্যান্স নেবেন, কিন্তু মরদেহ নিতে আপত্তি? এ কেমন নাগরিকত্ব?

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধাঅধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:১৮

Facebook
Twitter

রেমিট্যান্স নেবেন, কিন্তু মরদেহ নিতে আপত্তি? এ কেমন নাগরিকত্ব?

প্রিয় সৌদি আরবপ্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা, আপনাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। রেমিট্যান্সের জন্য আপনারা জাতীয় সম্পদ। অথচ মৃত্যুর পর আপনাদের মরদেহেরও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়! বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। এই ক্ষমা করুণা থেকে নয়, গভীর নাগরিক লজ্জা থেকে। যে মানুষগুলোর শ্রমে আমাদের অর্থনীতি সচল থাকে, তাঁদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আমাদের রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক সমাজের দায়বদ্ধতা এত দুর্বল কেন?

সৌদি আরব আমাদের কাছে ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ধর্মীয় শ্রদ্ধা, একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো এবং সেখানে অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য করতে না পারা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট।

প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশিরা সৌদি আরবে শ্রমিক হিসেবে যান, নাকি এমন এক শ্রমব্যবস্থায় প্রবেশ করেন, যেখানে তাঁদের শ্রমের ওপর অন্যের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু নিজেদের জীবনের ওপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হয়ে পড়ে?

সৌদি আরবে গৃহকর্মীরা সাধারণ শ্রমআইনের আওতায় নন; তাঁদের জন্য পৃথক বিধিমালা রয়েছে। কাফালা ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হলেও নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা, মজুরি বঞ্চনা, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং চলাচলে প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ এখনো গুরুতর। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের গবেষণায় অভিবাসী নারী গৃহকর্মীদের জবরদস্তিমূলক শ্রম, বর্ণবাদ, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ হয়েছে।

২০১৯ সালে বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের অনুসন্ধানে সৌদি আরবের Haraj ও Instagram-এ গৃহকর্মীদের অবৈধ কেনাবেচার বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। এগুলো বেআইনি কর্মকাণ্ড। কিন্তু এই অবৈধ বাজারের অস্তিত্বই দেখায়, শ্রেণি, জাতীয়তা, লিঙ্গ ও ক্ষমতার বৈষম্য কীভাবে একজন নারীর শ্রমের পাশাপাশি তাঁর শরীরকেও পণ্যে পরিণত করতে পারে।

সব অভিবাসী শ্রমিক দাস নন। কিন্তু মানবাধিকার গবেষণায় নথিবদ্ধ শোষণের কিছু পরিস্থিতি জবরদস্তিমূলক শ্রম ও আধুনিক দাসত্বের বৈশিষ্ট্য বহন করে। একজন মানুষ কাগজে-কলমে স্বাধীন শ্রমিক হলেই বাস্তবে তাঁর স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না।

*মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সংগ্রহ করা বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে ৮৮৭ বাংলাদেশির মৃত্যু নথিবদ্ধ হয়। প্রায় ৮০ শতাংশ মৃত্যুকে 'স্বাভাবিক মৃত্যু' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের হিসাবে ২০২৪ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪,৮১৩ বাংলাদেশি প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে।

কিন্তু মৃত্যুকে 'স্বাভাবিক' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা আর মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা এক বিষয় নয়। কর্মপরিবেশ, অতিরিক্ত তাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা কিংবা চিকিৎসার অভাবের সম্ভাব্য ভূমিকা কতটা তদন্ত করা হয়? কতজনের পরিবার প্রকৃত কারণ জানতে পারে? কতজন ক্ষতিপূরণ পায়?

যে শ্রমিকের জীবিত শরীর অর্থনৈতিক সম্পদ, তাঁর মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের কাছে সেই জীবনটির মূল্য কী?

এই প্রেক্ষাপটে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ মক্কায় দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ একটি মসজিদে 'অনৈতিক কাজের' অভিযোগ এনেছে। কিন্তু অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবীর সহায়তা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য বাংলাদেশের কাছে প্রকাশিত হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ মিশন ঘটনাটির বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আগে অবগত ছিল না। ১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

আমি কারও অপরাধকে সমর্থন করছি না। বরং জানতে চাই, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রকৃতি কী ছিল? তাঁরা যে ভাষায় বিচার হয়েছে, তা বুঝতে পেরেছিলেন কি? তাঁদের কার্যকর আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার যোগাযোগের সুযোগ ছিল কি?

ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে আটক বিদেশি নাগরিককে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করার বিধান রয়েছে এবং তাঁর অনুরোধে কনস্যুলেটকে জানাতে হয়। ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কনস্যুলেটকে যথাসময়ে অবহিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সুনির্দিষ্ট লঙ্ঘন নির্ধারণের জন্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রয়োজন। কিন্তু সৌদি আরব রাজতন্ত্র বলে এসব আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না।

অপরাধের বিচার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায্যতা দুটি পৃথক প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্রের আইন মানার বাধ্যবাধকতা সেই রাষ্ট্রের বিচারিক জবাবদিহিকে অকার্যকর করে না।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ঘটনাটিকে 'আমাদের জন্য একটা শিক্ষা' হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশের আইন মানতে হবে। কিন্তু একজন নাগরিকের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে তাঁর নিজ দেশের মিশন কিছুই জানতে পারল না—এটি কি আমাদের কূটনৈতিক ও প্রবাসী সুরক্ষাব্যবস্থার জন্যও শিক্ষা নয়?

এর চেয়েও বেদনাদায়ক বিএনপির সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতনের স্টার টিভিতে প্রচারিত মন্তব্য—“এ পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক এটা আমি চাই না।”

একজন জনপ্রতিনিধির বক্তব্য রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। কিন্তু তাঁর এমন মন্তব্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সংকট উন্মোচন করে।

একজন মানুষ অপরাধ করেছেন কি না, তা বিচারের বিষয়। কিন্তু তাঁর মরদেহ স্বদেশে ফেরার নৈতিক যোগ্যতা নির্ধারণের কর্তৃত্ব একজন জনপ্রতিনিধিকে কে দিয়েছে?

নাগরিকত্ব কি এখন নৈতিক পবিত্রতার সনদ?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে যেকোনো স্থানে অবস্থানরত নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভ ও আইনানুযায়ী ব্যবহার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। দণ্ডিত হওয়া মানেই নাগরিকত্ব বিলুপ্ত হওয়া নয়। মৃত্যুর পর মরদেহের সম্মানজনক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবারের প্রতি মানবিক দায়ও উপেক্ষা করা যায় না।

এই বিতর্কে অর্থনৈতিক বাস্তবতাটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে গিয়েছেন। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।

অর্থাৎ সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। সেই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার কূটনৈতিক দায়কে সীমিত করে দিতে পারে?

একই দেশে একজন ধনী বিদেশি পেশাজীবী এবং একজন দরিদ্র অভিবাসী নির্মাণশ্রমিক কাজ করেন। আইনগত অধিকারের পাশাপাশি তাঁদের সামাজিক ক্ষমতা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং অধিকার আদায়ের বাস্তব সামর্থ্যে বিশাল পার্থক্য থাকে। এখানে জাতীয়তা, শ্রেণি, অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা পরস্পরকে শক্তিশালী করে।

নৃবৈজ্ঞানিকভাবে সমস্যাটি এখানেই—অভিবাসী শ্রমিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য, অথচ অধিকার ও ক্ষমতার কাঠামোতে প্রান্তিক।

আমাদের রাষ্ট্র যেন প্রবাসী শ্রমিককে দুটি পৃথক পরিচয়ে বিবেচনা করে। অর্থনীতিতে তিনি দৃশ্যমান, কিন্তু বিপদে পড়লে তাঁর নাগরিক অধিকার প্রায়ই অদৃশ্য হয়ে যায়।

প্রবাসীদের জন্য বিমানবন্দরে লাউঞ্জ তৈরি, সম্মাননা প্রদান কিংবা তাঁদের 'রেমিট্যান্স যোদ্ধা' আখ্যা দেওয়া যথেষ্ট নয়। সম্মানের প্রকৃত পরীক্ষা হয় সংকটে। প্রয়োজন নিরাপদ শ্রমচুক্তি, নির্যাতিত শ্রমিকদের জন্য কার্যকর আশ্রয় ও আইনি সহায়তা, আটক নাগরিকদের জন্য দোভাষী ও আইনজীবী, অস্বাভাবিক মৃত্যুর স্বচ্ছ তদন্ত, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং দূতাবাসের জবাবদিহি।

পররাষ্ট্রনীতি কেবল রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পরিচালনা নয়। বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকটিকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতাও তার একটি মৌলিক পরীক্ষা।

প্রিয় সৌদি আরবপ্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা,

আপনাদের কাছে আমার ক্ষমাপ্রার্থনা এই কারণে যে, আমরা আপনাদের পাঠানো অর্থকে জাতীয় অর্জন মনে করি, অথচ আপনাদের নিরাপত্তাহীনতা, অপমান ও মৃত্যুকে সমান গুরুত্বের জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করতে শিখিনি।

আপনাদের রেমিট্যান্স গ্রহণ করতে আমাদের লজ্জা হয় না, অথচ আপনাদের মরদেহ গ্রহণের প্রশ্নে আমরা পাপ-পুণ্যের হিসাব করি!

একজন নাগরিকের মরদেহ রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার বিষয় নয়। লজ্জার বিষয় হলো, মৃত্যুর পরও তাঁর মানবিক মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।

নাগরিকত্ব কোনো নৈতিক পুরস্কার নয়। এটি এমন একটি অধিকার, যা অপরাধের অভিযোগ, শ্রেণিগত অবস্থান কিংবা সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। আজ প্রশ্নটি সৌদি আরবের শ্রমনীতি ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে। কিন্তু জবাবদিহির প্রশ্ন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছেও।

রাষ্ট্র যদি নাগরিকের শ্রমের অর্থকে জাতীয় সম্পদ মনে করে, তাহলে সেই নাগরিকের জীবন, অধিকার ও মৃত্যুর পর মর্যাদাকেও জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করতে হবে।রেমিট্যান্সের হিসাব রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রকে মানুষের জীবনেরও হিসাব দিতে হবে।



অনুসরণ করুন

logologologologologo

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন

Get it on

Google Play

Download on the

App Store

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বশেষ খবরের নির্ভুল গন্তব্য কলম২৪। বাংলাদেশ ও বিশ্বমঞ্চের ব্রেকিং নিউজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা কিংবা বিনোদনের সব খবর—সবার আগে আপনার হাতের মুঠোয়। খবরের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে এখনই ভিজিট করুন।

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মনিরা রওনক বুবলি

স্বত্ব© কলম২৪ (২০২৬)

ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।