আমাদের দেশে ভোটের ফলাফল নিয়ে নানা রিউমার কাজ করে। এগুলোকে রিউমার বা গুজব বলছি একারনেই যে, অনেক ক্ষেত্রেই সেগূলোকে আমার কাছে idle gossip মনে হয়। বিশেষ করে এবারের ভোটের ক্ষেত্রে হুদাই কইতাছে, রাইতের আঁন্দারে ভোটের মধ্যে কিছু একটা হইছে। এই গুজব শুধুমাত্র যারা হেরে গেছে তারাই ছড়াচ্ছে তা নয়। কিছু কিছু কথা কানে আসছে।
যেমন বলা হচ্ছে, ভোট সুষ্ঠু হলেও কিছু কিছু আসনে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে। অনেকে বলছেন, ঢাকা-১৩ আসনের মাওলানা মামুনুল হককে বলি দিয়ে জামাতের আমীরের আসন কনফার্ম করা হয়েছে। আবার অনেকে বলছেন, জনাব তারেক রহমান অনেক ভোটে হেরে গিয়েছিলেন, জামাতের আমীরকে জিতিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে ঢাকা-১৭ আসনে তিনি জিতে আসেন। কেউ বলছেন জামাত ১৫০ এর বেশী পেয়েছিল, তাদেরকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাবছি, মানুষ এত কিছু যে বলছে, এর কারন কি কি হতে পারে? আমার ভাবনা যাই হোক কিছু মানুষ এভাবে ভাবছে–
১। এবারের ভোটে ১০০% না হলেও কিছু কিছু আসনে সত্যিই কারচুপি হয়েছে
২। এবারের ভোট অন্তর্বর্তী সরকারের মেটিক্যুলাস ডিজাইনের অংশ
৩। ভোটে কারচুপি যদি নাই হবে তাহলে ভোট গুনতে এত সময় কেন লাগবে?
৪। কোন কোন আসনে কাউকে দেখলাম বিজয়ী ঘোষনার পর আবার অন্যজন বিজয়ী কিভাবে হয়?
৫। হ্যাঁ ভোট কেন এত বেশী হল?
এখন পর্যন্ত বিরোধী পক্ষ জামায়াত জোট ৩০ টি আসনের ফল পূণর্বিবেচনার আবেদন করেছে। অর্থাৎ এই ৩০ টি আসনের সবগুলো পেলেও জোটের আসন দাড়াই ১০৭ টি। সে হিসেবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন তারা পাচ্ছে না। তাহলে কেন এই হাইপ তৈরি করে রাখা হচ্ছে? আপনাদের মনে থাকার কথা ১৯৯৬ সালের ১২ ই জুনের নির্বাচনে বিএনপি ১১৬ টি আসনে জিতে আসে। সে সময় সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি দাবী করে আরও ১১২ টি আসনে ফল পূণঃগণনা করতে হবে। তারা ভোটের ফল মেনে না নিলেও সংসদের পূরো মেয়াদ সংসদে থাকে। এবার জামাত মাত্র ৩০ টি আসনের ফল পূণর্বিবেচনার দাবী করেছে।
এরকম অভিযোগ সবসময়ই থাকবে। এটা ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখার কৌশল। সমর্থকরা যাতে আগামী নির্বাচনে আবার স্ব স্ব দলের পক্ষে থাকে। তাদের ভেতরে যাতে একটা উদ্দীপনা থাকে, “আগামীতে সুযোগ পেলে আবার দেখিয়ে দেব”। ভোটার যদি জানে আমার প্রার্থীর জেতার সক্ষমতা নেই তাহলে অন্য প্রার্থীর পক্ষে চলে যেতে পারে।
যেসব আসনে পার্থক্য খুবই মার্জিনাল হয় সেসব আসনের ভোট বারবার গুনতে হয়। পোলিং এজেন্টরাও সহজে ছাড়ে না। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাত পার হয়ে যায়। তখন সন্দেহ দানা বাঁধে। কোন কোন আসনের ফলে একজন এগিয়ে থাকলেও পরে অন্যজন বিজয়ী হওয়ার কারন থাকে। যেমন পোস্টাল ব্যালটের ভোট যোগ করা, কোন একটা বিশেষ কেন্দ্রের ফল দেরীতে পৌছানো, রিকাউন্টিং ইত্যাদি। এবার বিভিন্ন চ্যানেলে ভোটের ফল বিভিন্নভাবে দেখিয়েছে। সবার উচিৎ নির্বাচন কমিশনের ঘোষনাকেই প্রাধান্য দেওয়া। অনেকেই বেসরকারি চ্যানেলের খবর দেখে কনফিউশনে পড়ে গেছেন। হ্যাঁ ভোট কেন ৬৮% হবে, এই বিতর্কও আছে। আমার জানামতে অন্ততঃ ১২ টি আসনে না ভোট জয়ী হয়েছে। তবে ‘না ভোটের’ ব্যালটটা একটু আলাদা ডিজাইন করলে সবাই সীলটা ঠিকমত মারতে পারতো। সেক্ষত্রে না ভোট আরও বেড়ে যেত বলে আমার বিশ্বাস।
আমাদের দেশে বেশ কিছু জাতীয় নির্বাচনে বিশেষ প্রার্থীকে ‘ডিক্লেয়ার দেওয়ার’ খারাপ নজীর রয়েছে। সেসব বিষয় আমাদেরকে প্রভাবিত করে। তাছাড়া গত ফ্যাসিস্ট আমলের তিনটি ভূয়া নির্বাচনের কারনে মানুষের মনে এখনও সন্দেহের ট্রমা রয়ে গেছে। ভোটারদের একটা অংশ ভাল ভোটের চিন্তা ভুলেই গেছে। সুতরাং এবারের ভোট কেমন হয়েছে, কত শতাংশ লোক ভোট দিয়েছে এসব যাচাই করতে হলে কট্টর সমর্থকদের চাইতে সাধারন মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করুন, সদুত্তোর পেয়ে যাবেন।
আমার বিশ্বাস এবারের ভোট ভাল হয়েছে তবে অনেকে নিজের মার্কা না পেয়ে অন্য একটা মার্কাকে ভোট দিয়েছে। সেই সমীকরণ আলাদা। সে হিসাব আপনার আমার নাগালের বাইরে।
ড. মো. আলতাফ হোসেন, কৃষি বিজ্ঞানী
মন্তব্য করুন