দেড় বছর ধরে সুদানের সাধারণ মানুষের প্রতি অবর্ণনীয় নিপীড়ন ও নির্বিচারে জঘন্য গণহত্যা চলে আসছে। আক্রান্তদের কোনো অনুনয় বিনয় আগ্রাসী মিলিশিয়াদের মন গলাতে পারছে না। অথচ ন্যূনতম প্রতিবাদ ভুলে বিশ্বসমাজ যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে যে গৃহবিবাদ শুরু হয়, সেটির ফলে কয়েক কোটি মানুষ ভিটেছাড়া হয়েছে।
মারা গেছে অন্তত দেড় লাখ মানুষ। তিন কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন, জরুরি সহায়তা ছাড়া যাদের বেঁচে থাকা দায়। জবরদস্ত মুসলিমের হাতে নিরীহ মুসলমান মারা যাচ্ছে বলে সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজও যেন নাকে সরষের তেল মেখে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এখন আর এই ইস্যুতে বায়তুল মোকাররম শুক্রবারে জাগে না।
আজহারী মালয়েশিয়া থেকে কোনো বয়ান ঝাড়ে না। মুফতি ইব্রাহিম স্বপ্নে আর কিছু্ই দেখে না। এদের সিলেকটিভ স্বপ্নরা ইন্ডিয়া আর গাজার বেলায় যতটা সরব সুদানের বেলায় ঠিক ততোটাই নীরব। এর বড় কারণ হলো সুদানের নিপীড়কদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে খোদ ইউনাইটেড আরব আমিরাত।
ধনী মুসলমানদের আইকন। সুদানে নিপীড়ক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স তথা আরএসএফকে অস্ত্র, অর্থ ও মনোবল দিয়ে যদিও স্বীকার করে না, তবু এটাই স্বীকৃত যে সুদানের গৃহযুদ্ধে সর্বোতভাবে কখনো দুই গ্রুপ কখনো সুবিধা অনুযায়ী এক গ্রুপকে সহায়তা করে ইউনাইটেড আরব আমিরাত। এর বিনিময়ে সুদানের মূল্যবান খনিজ স্বর্ণ ইউএই’র হস্তগত হচ্ছে। আশকারা পেয়ে আরএসএফ ধুমিয়ে অনারবদের ওপর জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির এমন ভণ্ডামির নজির খুব বেশি নেই।
সুদানে এক অদ্ভুত কিসিমের সরকার ছিল। ওমর হাসান আহমদ আল বশির সুদানি প্রাক্তন সামরিক অফিসার ও রাজনীতিবিদ। যিনি ১৯৮৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সুদানের সপ্তম রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে তিনি গণ বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হন। বশিরের ক্ষমতার অংশীদার ছিল সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এসএএফ ও বিরোধী মিলিশিয়া বাহিনী আরএসএফ। বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করে এই দুই গ্রুপ বেসামরিক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে মিলে অস্বস্তিকর জোট সরকার গঠন করে। অস্থিতিশীল ওই সরকারে মিলিশিয়া দুই গ্রুপ এক হয়ে বেসমামরিকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। পরে নিজেরাই একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।
যাদের দ্বারা প্রেসিডেন্ট বশির ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, জানজাউইদ যোদ্ধাদের নিয়ে সেই আরএসএফ মিলিশিয়া নিজেকে বাঁচাতে গঠন করেছিলেন খোদ প্রেসিডেন্ট নিজেই। যদিও তখনো তার অধীন সুদানি সরকারি সেনাবাহিনী এসএএফ ছিলই। দেখা গেল প্রেসিডেন্ট নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে আলাদাভাবে যে মিলিশিয়া গঠন করলেন গোপনে শক্তি ও সম্পদ সংগ্রহ করে ওই গ্রুপটিই হয়ে গেল বিদ্রোহী ও মহা বিপজ্জনক।
দ্য গার্ডিয়ানের কলাম লেখক নাসরিন মালিকের লেখা ‘সুদানের যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে কারা’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রকাশ্যে আসা এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় মানুষ মিলিশেদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছেন। এক ব্যক্তিকে একজন কমান্ডার বলছিলেন, ‘কেউ বাঁচবে না।’ এরপর তাকে গুলি করা হয়। কমান্ডার বলছিলেন, ‘আমি তোমাদের প্রতি কোনো দয়া দেখাব না আমাদের কাজ শুধুই হত্যা করা।’
এই সংলাপ ও ঘটনাক্রম থেকে অনুমান করা যায় সুদানে কী ধরনের ভয়াল মানবিক নিধন ও বিপর্যয় চলছে। এই যুদ্ধে কেবল ক্ষমতাধর ডোনাল্ড ট্রাম্প গংদের আদরের দুলাল ধনী রাষ্ট্র ইউএই নয়, এ ছাড়া আরো কিছু দেশ ও গোষ্ঠী জড়িত। যাদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদে ভরপুর সুদানের দিকে শকুনের শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে। যার খেসারত দিতে হচ্ছে সেখানকার এলফাশের ও দারফুর এলাকার ভুখানাঙা সাধারণ মানুষকে।
বাংলাদেশেও আমরা শুনতে পাচ্ছি সরকারের তরফে ৯ হাজার তরুণকে অস্ত্র চালানো প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে নাকি দেশের সবাইকে সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। আমরা এইসব উদ্ভট পলিসির মেকারদের সুদানের উদাহরণ দেখে নিতে বলব। বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধ করব ছাই, অন্তর্কোন্দলে আমরাই বিশ্বসেরা। ৫৪ বছরের একটা স্বাধীন দেশে কোনো একটি ইতিবাচক ইস্যুতে আমাদের ন্যূনতম ঐকমত্য নেই। এখানে রাষ্ট্রীয় বাহিনী, রক্ষীবাহিনী কিংবা আলাদা মিলিশিয়া কারো ব্যক্তিগত বা দলীয় নিরাপত্তারই এতটুকু সুরক্ষা দেবে না। তাই যদি দিত একনায়ক শেখ হাসিনাকে ওমর আল-বশিরের পরিণতি ভোগ করতে হতো না। এবং ভাবীকালের ক্ষমতাবানরাও ওই পরিণতির চৌদ্দশিক কিংবা বন্দুকের নল থেকে রেহাই পাবে না।
আমরা যদি দেশটাকে স্থিতিশীল দেখতে চাই, মানবিক সমাজ গড়বার দিকে নজর না দিয়ে অন্যথা করবার উপায় নেই। সামরিক কাজ সামরিক বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করে গণমানুষের সাংস্কৃতিক বদলটাই সবার আগে জরুরি। প্রাইমারিতে সঙ্গীত ও শরীরচর্চা শিক্ষা রহিত করা কোনো কাজের কথা না। আমাদের বেসিক শিক্ষায় যে গলদটা রয়ে গেছে সেটির মূলোৎপাটন করে বিশুদ্ধতা ও সাধুতা চর্চার দিকে সবার মনোযোগ ফেরাতে হবে। মানুষ যদি জ্ঞান, বুদ্ধি, যুক্তি, বিবেক, বোধ, বিজ্ঞানমনস্ক, উদারনৈতিক, পরমতসহিষ্ণু, সহনশীল, সদাশয়, পরোপকারী, নিঃস্বার্থ, আত্মত্যাগী, দয়ালু, প্রেমময় ও সহজ হয়, তাহলেই কেবল সভ্য দেশের তালিকায় আমরা নাম লেখাতে পারব। সেদিন নিজের বাপও যদি অন্যায় পথে হাঁটে -সেটিরও তীব্র প্রতিবাদ জারি রাখতে পারব আমরা। সুদানের মতো যেকোনো বৈশ্বিক মানবিক বিপর্যয়ে তখন আমাদের প্রাণটাও বেদনায় আর্দ্র হবে, কেঁদে আকুল হবে।
লেখক: সাংবাদিক
মন্তব্য করুন