আমি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে এসেছি। আল্লাহ পাক আমাকে নতুন জীবন দান করেছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট যখন ফ্যাসিবাদ সরকারের পতন হয়, তখন আমি সিরাজগঞ্জ সিআইডিতে বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএস) হিসাবে কর্মরত ছিলাম। স্বৈরাচারের পতনের খবর আমি টেলিভিশনে দেখি। এটা দেখার পর আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। একটি মাইক্রোবাস ভাড়া করে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা করি আনন্দ মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য। ঢাকার সন্নিকটে গাজীপুরে আনসার একাডেমির সামনে আসার পরই উত্তেজিত জনতা আমার মাইক্রোবাস আটকে দেয়। আমি পুলিশ পরিচয় দেওয়ার পরই তারা হামলা চালায়।
তাদের বলি, আমি একজন নিষ্পেষিত, অবহেলিত পুলিশ। কিন্তু তারা বিষয়টি বুঝতে চাননি। কেবল পুলিশ হওয়ায় আমার ওপর আক্রমণ চালান। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক
সম্প্রতি গণমাধ্যমে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। ফ্যাসিস্টরা যেন আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সেই লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেছেন বলেও জানান তিনি।
রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আমি দ্বিতীয় জীবন পাওয়ায় স্ত্রী তার স্বামীকে পেয়েছে। আমার ভাই-বোন তার ভাইকে পেয়েছে। প্রিয় দুই কন্যাসন্তান ফিরে পেয়েছে তার বাবাকে। তিনি বলেন, আমার ওপর হামলার ঘটনা মনে পড়লে এখনো বিশ্বাস করতে পারি না যে, আমি বেঁচে আছি।
মাঝেমধ্যেই মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে ওই ভয়াল স্মৃতির কথা মনে পড়ে যায়। তখন নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। আমি মনে করি, দেশ ও জাতির সেবা করার জন্যই আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যতদিন বেঁচে আছি, যতদিন কর্মক্ষেত্রে থাকব; ততদিন যেন মানুষের সেবা করে যেতে পারি, একটি জনবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখতে পারি-সে প্রত্যাশা সব সময়।
হামলার ঘটনা বর্ণনা করে পুলিশ কর্মকর্তা রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আমার ব্যাগ চেক করে তারা (ছাত্র-জনতা) আইডি কার্ড পান। ওই কার্ড দেখার পর কোনো কিছু না শুনেই তারা আমার ওপর হামলা শুরু করেন। ওই সময় এমন পরিস্থিতি ছিল যে, উত্তেজিত জনতার লক্ষ্যবস্তু ছিল পুলিশ। কারণ, ফ্যাসিবাদ সরকারকে রক্ষায় আগের সাড়ে ১৫ বছর পুলিশের উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তারা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। তারা যেন দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। এ কারণেই ওই সরকার পতনের পর পুলিশের ওপর ঢালাওভাবে আক্রমণ হচ্ছিল। আমি যে ফ্যাসিবাদবিরোধী পুলিশ কর্মকর্তা, সেটাও আন্দোলনকারীদের বোঝাতে পারছিলাম না। তারা মনে করেছিল, পুলিশ মানেই স্বৈরাচারের লোক।
এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, যখন আমার জ্ঞান ফেরে, তখন আমি গাজীপুরের একটি ক্লিনিকে নিজেকে দেখতে পাই। ওইসময় ফের আমার পরিচয় জানতে চাওয়া হলে আমি প্রকৃত ঘটনা খুলে বলি। এরপর তারা আমাকে অনেক সহযোগিতা করেন। ওই সময় আমার কাছে কোনো কিছুই ছিল না। স্ত্রীর মোবাইল নম্বর মুখস্থ ছিল। আমি তাদের কাছে স্ত্রীর মোবাইল নম্বরটি বলি। এরপর তারাই আমার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। স্ত্রী দ্রুত একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ছুটে আসে ক্লিনিকে। পরে সেখান থেকে নেওয়া হয় রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে। সেখানকার আইসিইউতে ছিলাম সাতদিন। ছাত্র-জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, তারা আন্দোলন না করলে আজ আমরা নতুন বাংলাদেশ পেতাম না। আর নতুন বাংলাদেশ না হলে আমি আজকের অবস্থায় পৌঁছাতে পারতাম না। তিনি আরও বলেন, আজকের এ পর্যায়ে আসার জন্য প্রধান উপদেষ্টা এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রতি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
মন্তব্য করুন